রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অর্ধশত

রাজধানীর বনানীর বহুতল ভবন এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডে আহত প্রায় অর্ধশত ব্যক্তিকে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতরা কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল, অ্যাপোলো হাসপাতাল, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল ও বনানী ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় আহতদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য রাজধানীর সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। গতকাল বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় মন্ত্রী বলেন, আহতদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা দিতে রাজধানীর সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালকে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অর্ধশত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সব খরচ সরকার বহন করবে।

ইউনাইটেড হাসপাতালে ২৩

অগ্নিকান্ডের পর সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ  তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। নিহতরা হলেন মনির (৫০), মামুন  (৩০) ও মাকসুদুর (৩২)। নিহতরা কেউ অগ্নিকান্ডের সময় জীবন বাঁচাতে ভবনের বিভিন্ন ফ্লোর থেকে লাফ দিয়ে, কেউ তার বেয়ে নিচে নামতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়ে মারা যান। হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা তাহমিদা আহমেদ জানান, দুর্ঘটনায় আহতাবস্থায় ২৩ জনকে ইউনাইটেডে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। আহতদের অনেকেই লাফ দিয়ে নিচে পড়ে আহত হন। আহতদের মধ্যে রুমানা (২৬) ও নাজিয়া (২৬) নামে দুই তরুণী রয়েছেন।

জানা গেছে, নিহত মামুন রিজেন্ট এয়ারের কর্মকর্তা ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুরের বালিয়াকান্দিতে। নিহত মাকসুদুর পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি ওই ভবনে থাকা হেরিটেজ ট্রাভেল এজেন্সির অফিসে কর্মরত ছিলেন। তার স্ত্রী রুমকি রহমানও একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে খুঁজতে আসা মাকসুদুরের খালা সাকিনা হক জানান, ঘটনার সময় মাকসুদুরের স্ত্রী রুমকি রহমান স্বামীর সঙ্গে ওই ভবনে ছিলেন। কিন্তু রুমকিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রাত ৮টা পর্যন্ত তার সন্ধান পাননি তার স্বজনরা। আর নিহত মনিরের পরিচয় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা যায়নি। আহতদের সবাই ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছেন। কারও অবস্থায়ই আশঙ্কাজনক নয়।

কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি ৪৪, লাফ দিয়ে মারা যান শ্রীলঙ্কান নাগরিক নিরস চান্দে রাজধানীর বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনায় লাফিয়ে পড়ে নিহত হয়েছেন শ্রীলঙ্কান নাগরিক নিরস চন্দ (৩০)। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ভবনটিতে আগুন লাগলে সাততলা থেকে লাফিয়ে পড়েন তিনি। পরে তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় আহত হয়ে এ হাসপাতালে ভর্তি হয়ছেনে ৪৪ জন। একজন ছাড়া বাকি সবাই আশঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী রশীদুন্নবী। তিনি বলেন, কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি একজন ব্যক্তির শরীরে কিছু অংশ পুড়ে গেছে। এ ছাড়া বাকিরা আগুনের ঘটনায় আতঙ্কগ্রস্ত অথবা ধোঁয়ার কারণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি বলেন, আহতদের চিকিৎসায় আমাদের সব ধরনের সুবিধা প্রস্তুত রয়েছে। তবে গুরুতর কোনো কিছু ঘটার আশঙ্কা দেখা দিলে রোগীদের দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে। 

গতকাল বিকেলে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে গিয়ে দেখা যায়, কয়েক মিনিট পর পর অ্যাম্বুলেন্সে আসছেন আহত ব্যক্তিরা। তবে এ প্রতিবেদক যাদের দেখেছেন তাদের কাউকে অগ্নিদগ্ধ দেখা যায়নি। হাসপাতালের বাইরে আহত ব্যক্তিদের কয়েকজন স্বজনকে কান্নারত দেখা যায়। সাংবাদিকরা কথা বলতে চাইলে রাজি হননি তারা। সন্ধ্যার দিকে এক তরুণী প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকরা ঘটনার বর্ণনা জানতে চাইলে তার স্বজনদের অনুরোধে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। ওই তরুণীর বাম হাতের দুটি আঙুলে হাল্কা ব্যান্ডেজ দেখা গেছে।

এ হাসপাতালে ভর্তি আছেন মোট ৪৪ ব্যক্তি। তাদের মধ্যে নাম জানা গেছে ৪৩ জনের। তারা হলেনÑ ফাহিম ফয়সাল (৩০), হিমু (৩০), সুশান্ত (৪০), ফজলুল হক (২৫), আরিফ (৩২),  রেজওয়ান আহমেদ (৪৫), ফাহিম (৩০), মহিউদ্দিন, মামুন (৩০), মুরাদ (৪১), রেফাতউল্লাহ (৩৮), ফজলুল হক, মাহিন (৩৫), নাজমুল, স্মৃতি (২৫), নিরস (নিহত), নজরুল ইসলাম (৩৩)।  নূর আলম (২৩), ফয়সাল (৩২), রাশেদ (৪২), হাসান (১৮), ফয়েজ আহমেদ, ফারহানুর রহমান (২৮), অনুপম দেবনাথ (৩৫), সবুর খান (৪২), লিলিমা মাহবুব (২৯), বি সরকার (৪১), মোজহার হোসেন (৪১), মামুন (৩০), মোস্তাফিজুর রহমান (৪১), মহিউদ্দিন (২৩), মোহাম্মদ হোসেন (৩৬), সেজুতি কামাল (২৯), রিহাদ (৩৪)। কামাল হোসেন মজুমদার (৪৫), তাহরিম (৩৫), মারজেল হোসেন (৩০), পারভেজ, নূর হোসেন (২৮), তৌফিক (৩২)।

ঢামেকে ভর্তি ৫, রুমকির পরিচয় মিলেছে

রাত ৮টা পর্যন্ত এই হাসপাতালে এসেছে আব্দুল্লাহ আল ফারুক তমাল (৩০) ও রুমকি আক্তারের (৩০) লাশ। রুমকির স্বামী মাকসুদুর রহমানও (৩৫) এই ভবনের আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। নিহত মাকসুদুরের খালাত ভাই ইমতিয়াজ আহমেদ রাতে হাসপাতালের মর্গে রুমকির লাশ শনাক্ত করেন। তিনি জানান, তাদের বাড়ি নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার দিলা কুড়িগ্রামে। রুমকির বাবার নাম আশরাফ আলী। তারা স্বামী-স্ত্রী রাজধানীর গে-ারিয়ার আলমগঞ্জ লেন ১১ নম্বর বাসায় থাকতেন। দুজনই বনানীর এফ আর টাওয়ারের ১১ তলার একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি করতেন। অগ্নিকা-ের ঘটনায় কর্মরত অবস্থায় স্বামী-স্ত্রী দুজনই দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। মাকসুদুরের লাশ ইউনাইটেড হাসপাতালে আছে। আর রুমকির লাশ ঢাকা মেডিকেলের মর্গে।

এই হাসপাতালে আহত অবস্থায় বার্ন ইউনিটে চারজন ভর্তি আছেন। তারা হলেনÑ রেজওয়ান আহমেদ (৩৫), সাব্বির আলী মৃধা (১৯), তৌকির ইসলাম (৩১) ও আ. সবুর খান (৪২)। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন শ্রীলঙ্কান নাগরিক ইন্ডিকা (৪৬) ও আবু হোসেন (৩৫)।

এই ঘটনায় উদ্ধার কাজে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের স্টাফ অফিসার উদ্দীপন ভক্ত (২৯) ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে এসেছেন।

হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ফারুকের শরীরের ৯২ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। আর রেজওয়ান ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ায় তার মাথা, হাত-পাসহ শরীরে বেশ কিছু হাড় ভেঙে গেছে। এ ছাড়া আরও আঘাত রয়েছে তার শরীরে। সাব্বিরের পা দগ্ধ হয়েছে ও ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আর তৌকির ও সবুরের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।

অ্যাপোলো হাসপাতালে ৯

অ্যাপোলো হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্মকর্তা কিশোর গোড়াল জানান, আহত ৯ জন সেখানে ভর্তি আছেন। তাদের মধ্যে চারজনকে জেনারেল কেয়ার ইউনিটে রাখা হয়েছে। বাকি পাঁচজন ভর্তি আছেন জেনারেল ওয়ার্ডে। এ ছাড়া হাসপাতালে আনার পথে শাহেদা আমিনা ইয়াসমিন (৪৮) নামে একজন নারীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি আগুন লাগার পর ভবনের পাশে একটি কেবল বেয়ে নামতে গিয়ে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। তাকে অ্যাপোলোতে আনার পথে মারা গেছেন। চিকিৎসাধীন সবাই আশঙ্কামুক্ত বলে জানান কিশোর।