প্রকল্প বাস্তবায়নের অবস্থা যাই হোক না কেন গাড়ি ও অফিস ভাড়া পেতে মরিয়া প্রকল্প পরিচালকরা (পিডি)। অথচ উপসচিব পর্যায়ের সব কর্মকর্তাকে সরকার ব্যক্তিগত গাড়ি সুবিধা দিয়েছে। এ জন্য আগামী বাজেটে সব ধরনের প্রকল্প থেকে গাড়ি সুবিধা বাতিল করা উচিত। একই সঙ্গে উন্নয়নে সমন্বয়হীনতা দূর করাও জরুরি। সবাই দুর্নীতির কথা বলে অপচয় নিয়ে চিন্তা করে না। বাজেটে এই বিষয়গুলো সমাধানে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সচিবরা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় সচিবরা এসব কথা বলেন। আসন্ন বাজেট নিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের ধারাবাহিক প্রাক-বাজেট আলোচনার অংশ হিসেবে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সচিবরা ছাড়াও সাবেক অর্থ সচিব মুসলিম চৌধুরী বক্তব্য রাখেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে পরিকল্পনা সচিব নুরুল আমিন বলেন, এখন উপসচিব কর্মকর্তাদের সরকারিভাবে গাড়ি দেওয়া হচ্ছে। তাহলে প্রকল্প পরিচালকদের কেন আলাদাভাবে গাড়ি দেওয়া হয়। আমার মনে হয়, আগামী বাজেট থেকে পিডিদের গাড়ি দেওয়ার অপশনটি বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহমেদ বলেন, আমরা দুর্নীতি নিয়ে সবাই কথা বলি, কিন্তু সরকারের বিভিন্ন সেক্টরের অপচয় নিয়ে কথা বলি না, চিন্তাও করি না। দেখা যায়, ভালো ভালো গাড়ি পড়ে আছে, কিন্তু ব্যবহার হচ্ছে না। আমরা দক্ষ মানুষ গড়তে চাই কিন্তু প্রশিক্ষণ খাতে তেমন বরাদ্দ চাই না। আগামী বাজেটে বিভিন্ন সেক্টরের প্রশিক্ষণ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত।
স্থানীয় সরকার সচিব এস. এম. গোলাম ফারুক বলেন, প্রতি বাজেটেই বলা হয়, নতুন করদাতা বাড়ানো হবে। আমরা মনে হয়, মাঠ পর্যায়ে নতুন করদাতা শনাক্ত করতে স্থানীয় সরকারকে কাজে লাগানো উচিত। প্রতি পরিবারে চাকরির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় সরকারকে অবশ্যই শক্তিশালী করতে হবে।
বেসামরিক বিমান ও পর্যটন সচিব মাহবুব আলী বলেন, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) বহু প্রকল্প নেওয়ার কথা বলছি। কিন্তু এগুলোর তেমন অগ্রগতি হচ্ছে না। একেকটা প্রকল্প বাস্তব রূপ পেতে ৪-৫ বছর সময় লেগে যাচ্ছে। পিপিপি অফিস বলছে, তারা বিনিয়োগকারী পাচ্ছে না। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলে, বিনিয়োগকারীরা টার্ম অ্যান্ড কন্ডিশন বদলাতে বলছে, ঋণের সুদের হার কমাতে বলছে। পিপিপির বাস্তব অগ্রগতি দেখতে হলে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিক কবির বিন আনোয়ার বলেন, উন্নয়নে চরম সমন্বয়হীনতা রয়েছে। ৫৩টি মন্ত্রণালয় যে যার মতো করে কাজ করছে। হাওরে সবাই উন্নয়ন প্রকল্প নিচ্ছে। কিন্তু যে যার মতো করে করছে। এতে সুষম উন্নয়ন হচ্ছে না।
সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী বলেন, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে বিস্তর ফারাক রয়েছে। দেখা যায় নতুন করে সংশোধন করার সময় শেষ হয়ে যায় তবুও বাস্তবায়ন হয় না। এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া চাই। কারণ এতে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হচ্ছে না।
তিনি বলেন, উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণ করার নামে গ্রামেগঞ্জে অবকাঠামো সুবিধা গড়ে তোলা হচ্ছে। মনে করা হচ্ছে এসব অবকাঠামো থেকে মানুষ সুবিধা নেওয়ার জন্য আসবে। কিন্তু আসলে তা হচ্ছে না। এজন্য ডিজিটালাইজেশনের দিকে যেতে হবে। সুবিধা নেওয়ার জন্য মানুষ আসবে না, মানুষের কাছে সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে।
সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বাজেট তৈরি করা হবে। কারও ওপর বাজেট চাপিয়ে দেওয়া হবে না। দেশের সকল মানুষকে সম্পৃক্ত করা হবে। আর হাওর অঞ্চলসহ পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা বরাদ্দ দেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী বাজেটে উন্নয়ন প্রকল্পকে দুই ভাগে ভাগ করা হবে। এর মধ্যে একটা হচ্ছে সংক্ষিপ্ত সময়ে অন্যটা হচ্ছে দীর্ঘ সময়ে। এ সময়ে পরিকল্পনা কমিশনকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
জেলা বাজেটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো রেভিনিউ। সুতরাং যেখানে আয় হবে সেখানে ব্যয়ও থাকবে। জেলায় যদি বাজেট দেওয়া হয় সেই খান থেকে আয়ও আসতে হবে। সব জেলা থেকে তো আয় সমান হয় না। ফলে জেলা বাজেট দিলে একটা কমপিটিশন শুরু হবে। এ ধারণাটা ভালো কিন্তু বাস্তবায়নে তিনি দ্বিমত পোষণ করেন।