রাজধানীর বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের তিনটি কারণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বৈদ্যুতিক গোলযোগ, এয়ার কম্প্রেসার বিস্ফোরণ ও জ্বলন্ত সিগারেট থেকে আগুন ধরেছে। ঘটনার পরের দিন গতকাল শুক্রবার ফায়ার সার্ভিসের পাঁচ সদস্যের তদন্ত দল ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেছে। অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ খুঁজতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ শুরু করেছে।
ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত দলের প্রধান ও উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাব্য সব ধরনের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কী কারণে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তা খুঁজে বের করার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে ৭, ৮ ও ৯ তলায় অগ্নিকাণ্ডের আলামত সন্ধান করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পরেই এ বিষয়ে
বিস্তারিত জানানো হবে।’ ফায়ার সার্ভিসের
জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিক অনুসন্ধানে সপ্তম তলার বায়িং হাউসের ভস্মীভূত বিভিন্ন আলামত পরীক্ষা করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই ফ্লোর থেকেই বৈদ্যুতিক গোলযোগ, এয়ার কম্প্রেসার (এসি) বা জ্বলন্ত সিগারেট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।’
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক ছালেহ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণেই এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক সংযোগে পরিচালিত বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির ব্যবহার রয়েছে এ ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে। এসবের যেকোনো একটি থেকেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘৮, ৯ ও ১০ তলার যেকোনো একটিতে প্রথম অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে। এরপর তা বিভিন্ন ফ্লোরে ছড়িয়েছে।’
তবে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তার এমন তথ্যে ভিন্নমত পোষণ করেন অষ্টম তলায় অবস্থানকারী নূরে আলম সিদ্দিকী। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, অষ্টম তলার মালিক সৈয়দ আমিনুর রহমান। তার মালিকানাধীন এআই ফ্রেইট নামে আমদানি-রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ছিল ওই তলায়। এই প্রতিষ্ঠানের ৩০টি ল্যাপটপ, কয়েকটি প্রিন্টার, চেয়ার, টেবিল ও বিভিন্ন নথিপত্র ছিল। এখান থেকে আগুনের ঘটনা ঘটেনি। আগুন লেগেছে সপ্তম তলা থেকে। তিনি বলেন, ‘সপ্তম তলায় ছিল একটি বায়িং হাউসের প্রতিষ্ঠান। আগুন লাগার খবর পেয়েই তাদের প্রতিষ্ঠানের লোকজন সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে পাশের এফ আর টাওয়ারে লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। কিন্তু তাদের প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম (৪২), হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন (৩০) ও পরিবহন কর্মকর্তা জাফর আহমেদ (৫০) আগুনে পুড়ে মারা যান। এ ছাড়া তাদের অফিসের তিনজন আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। বাকি প্রায় ৩০ জন বাইরে বেরিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন।’
ভবনের ব্যবস্থাপক কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, সপ্তম তলার বায়িং হাউসের লোকজন নিয়মিত সিগারেট ধরাতেন। তার ধারণা, সেখান থেকেই প্রথম আগুন ধরেছে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১টায় ২২ তলা ভবনটিতে আগুন ধরে। এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের ২২টি ইউনিট আগুন নেভানো ও হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধার শুরু করে। পাশাপাশি সেনা, বিমান, নৌবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, রেড ক্রিসেন্টসহ ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষিত অনেক স্বেচ্ছাসেবী কাজ করে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ততক্ষণে ২৫ জনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে স্বরাষ্ট্র, গণপূর্ত, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন (আইইবি) তদন্ত করছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবন ও এর আশপাশ এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন কমিটির সদস্যরা। ভবনের প্রকৌশল ও কারিগরি বিষয়গুলোও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন তারা।