বহরমপুরে বিজিবির গুলিবর্ষণ

গুলিবিদ্ধ ছেলেকে বাঁচাতে ভিটা বিক্রি মায়ের

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার বহরমপুরে বিজিবি সদস্যদের গুলিবর্ষণে আহত দিনমজুর সোহেল রানা বাবু (২২) এখনো চিকিৎসাধীন হাসপাতালে। তার চিকিৎসার খরচ জোগাতে তিনটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন মা জিন্নারা খাতুন। সেই টাকা শেষ হলে ছেলেকে বাঁচাতে বিক্রি করেন একমাত্র সম্বল পাঁচ শতকের বসতভিটার তিন শতাংশ জমিও। জমি বিক্রির দেড় লাখ টাকাও ছেলের চিকিৎসার পেছনে খরচ করেন। কিন্তু সব মিলিয়ে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ করেও এখনো সুস্থ করে তুলতে পারেননি ছেলেকে।

অন্যদিকে এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের বোঝাও সামলাতে পারছেন না জিন্নারা। ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে অনেক সময় পালিয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে। স্থানীয় বহরমপুর বাজারে সোহেলের বাবা-মা দুজনে মিলে একটি ছোট দোকান চালান। সেখানে সারা দিন চা ও পরোটা-রুটি বিক্রি করে লাভ হয় মাত্র দুই-আড়াইশ টাকা। কিন্তু সেই টাকা দিয়ে সংসার চলবে নাকি ছেলের চিকিৎসা করাবেন এ নিয়ে  দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে সোহেলের বাবা-মায়ের। এ ছাড়া মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে এনজিও থেকে নেওয়া ঋণ।

সপ্তাহ পেরোলেই তিনটি সংস্থা থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তির টাকা নিতে মাঠকর্মীরা এসে বসে থাকছেন। প্রতি সপ্তাহে ২১০০ টাকা কিস্তির ঘানি টানতে হয় সোহেলের বাবা-মাকে।

ডান পায়ে একটি ও বাম পায়ে ৪টি গুলিবিদ্ধ হয়ে দিনাজপুর আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন সোহেল। ঘটনার দেড় মাস পেরিয়ে গুলিবিদ্ধ অন্য ১৩ জন বাড়ি ফিরে চিকিৎসা চালিয়ে গেলেও সোহেল এখনো হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। তিন বছরের ছেলেকে     নিয়ে সোহেলের স্ত্রী ময়না বেগম হাসপাতালে তার পাশে থেকে সেবা-শুশ্রুষা করছেন।

জিন্নারা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছেলে মরে গেলেও তিন দিন কেঁদে নিজেকে বুঝ দিতে পারতাম। দুই পায়ে ক্ষত, উঠতেও পারে না, বসতেও পারে না। বেঁচে থাকলেও সে চলাচল করতে পারবে কি না সন্দেহ। আজ আমি নিঃস্ব।’

ছেলের চিকিৎসার জন্য ভিটা বিক্রির কথা জানিয়ে জিন্নারা খাতুন আরও বলেন, ‘এখন ছেলে বাড়িত আসলে তাকে কোথায় রাখব। এ ছাড়া এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সেই বোঝাও সামলাতে পারছি না। সমিতির কিস্তির ভয়ে অনেক সময় পালিয়ে থাকতে হচ্ছে।’

সোহেলের মতো প্রায় পঙ্গু জীবন কাটাচ্ছেন বহরমপুর গ্রামের জয়গুন বেগম। দিনাজপুরে ২৪ দিন চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেও স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারছেন না তিনি। লাঠিতে ভর করে অন্যের সাহায্য নিয়ে ঘর থেকে বের হতে হয় তাকে। দিনমজুর স্বামী মফিজুল ইসলাম এরই মধ্যে জয়গুনের চিকিৎসার পেছনে খরচ করেছেন লক্ষাধিক টাকা। এখন জয়গুনের জন্য ওষুধ কিনতে প্রতি তিন দিনে খরচ হয় এক হাজার টাকা। কিন্তু সেই টাকা জোগার করতে তার স্বামীর নাভিশ্বাস অবস্থার কথা জানান জয়গুন।

বিজিবির গুলিতে আহত একই গ্রামের তৈমুর রহমানের অবস্থা আরও শোচনীয়। বিছানা থেকে উঠে বসতেও পারেন না। পেশায় কৃষক তৈমুরের স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। স্কুল ও কলেজ পড়–য়া সন্তানদের লেখাপড়া প্রায় বন্ধের পথে। অর্থাভাবে তার চিকিৎসাও অনেকটা থমকে আছে।

আগামী দিনের কথা ভেবে চোখে অন্ধকার দেখছেন জানিয়ে তৈমুর বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে চিকিৎসার খরচ দেওয়ার আশ্বাস পেলেও এখনো কোনো সহযোগিতা মেলেনি। তাই আমার মতো গুলিবিদ্ধদের অধিকাংশেরই চিকিৎসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।’

একই অবস্থা গ্রামের রুবেল, রাসেল, মিঠুন ও ইছার উদ্দিনের। তাদেরও অর্থাভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেলেও জীবনসংগ্রামে কেউ চালাচ্ছেন অটোরিকশা আবার কেউ বা পরিচালনা করছেন চায়ের দোকান।

ইছার উদ্দিন বলেন, ‘এক হাত দিয়ে এখনো কাজ করতে পারি না। এরপরেও চিকিৎসার খরচ জোগাতে চায়ের দোকান করছি। এ ছাড়া ছেলে-মেয়ের মুখেও তো খাবার জোগাতে হবে।’

বিজিবির গুলিতে আহতদের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তার বিষয়ে জানতে চাইলে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক কে এম কামরুজ্জামান সেলিম বলেন, ‘গুলিবিদ্ধরা বাড়িতে ফিরেছে। তাদের আর্থিক অবস্থা নাজুক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুলিবিদ্ধদের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য তালিকা প্রস্তুত করা হবে।’

গত ১২ ফেব্রুয়ারি বহরমপুর গ্রামে ভারতীয় সন্দেহে গরু জব্দ করাকে কেন্দ্র করে বিজিবি-গ্রামবাসী সংঘর্ষ হয়। তখন বিজিবি সদস্যরা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করলে ঘটনাস্থলেই শিশু জয়নুল, কৃষক সাদেক ও শিক্ষক নবাব মারা যান। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয় ১৪ গ্রামবাসী।