রাজধানীর বনানীর এফ আর টাওয়ারের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই পাশের আরেক অভিজাত এলাকা গুলশানে বড় ধরনের অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। গুলশান-১ নম্বরে অবস্থিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কাঁচাবাজার ও সুপার মার্কেটে গতকাল শনিবার ভোরে আগুন লেগে নিঃস্ব হয়েছেন অন্তত ৩০০ ব্যবসায়ী। বনানীর এফ আর টাওয়ারের ভয়াবহ ঘটনার এক দিনের মাথায় রাজধানীর ব্যস্ততম এই মার্কেটে এ ঘটনা ঘটল। ভোরের দাউ দাউ আগুনে নিঃস্ব ব্যবসায়ীদের কান্না আর আহাজারিতে সারা দিনই গুলশান এলাকার আকাশ-বাতাস ছিল ভারী।
এর আগে ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি এই মার্কেটে ভয়াবহ আগুনে নিঃস্ব হয়েছিলেন ৬০০ ব্যবসায়ী। সে ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার আগেই আবারও আগুনে নিঃস্ব হলেন তাদের অনেকে। ভোর সাড়ে ৫টার দিকে লাগা এ আগুন ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টার চেষ্টায় নেভাতে সক্ষম হয়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, ঘটনাটি নাশকতা কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এখানে একটি বহুতল অত্যাধুনিক মার্কেট নির্মাণ করা হবে।
এ ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। কমিটির সাত দিনে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। একই ঘটনায় ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলীকে আহ্বায়ক করে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার কথা পাঁচ দিনে।
ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্তব্যরত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, শনিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আগুন লাগার পর তারা পৌনে ৬টায় খবর পান এবং ১০ মিনিটের মধ্যেই তাদের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করে। তাদের ২০ ইউনিটের সম্মিলিত চেষ্টায় সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ১০টা ৩০ মিনিটে আগুন সম্পূর্ণ নেভানো সম্ভব হয়।
গুলশান-১ নম্বর ডিএনসিসি মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি দীন মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগুনে কাঁচাবাজার ও সুপার মার্কেটের ছোট-বড় প্রায় ৩০০ দোকান পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পাঁচতলা গুলশান শপিং সেন্টারের কয়েকটি দোকানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কাঁচাবাজার লাগোয়া গুলশান-১ নম্বর ডিএনসিসি মার্কেটের ক্ষতি হয়নি। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে একই স্থানে আগুনে কাঁচাবাজার সুপার মার্কেটসহ ডিএনসিসি মার্কেটটিও পুড়েছিল।
ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৭ সালের আগুনের পর তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে যেসব সুপারিশ করা হয়েছিল সেসব সুপারিশ এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। সেখানে কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও ছিল না। চারবার নোটিস দেওয়া হলেও তারা তা আমলে নেয়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা ঘুরে দাঁড়াতে সরকারের কাছ থেকে সহায়তা চেয়েছেন। তারা বলছেন, ২০১৭ সালের আগুনের পর তারা সরকারি সহায়তা পাননি। নিজের চেষ্টায় ঘুরে দাঁড়িছিলেন। আবারও আগুন তাদের সবকিছু কেড়ে নিল।
সরেজমিন দেখা গেছে, আগুন লাগার পর উদ্ধার কাজের জন্য গুলশান-১ নম্বর সংলগ্ন সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। আগুন পুরোপুরি নেভার পর সড়ক খুলে দেওয়া হয়। আগুন লাগার পর বনানীর মতো গুলশানেও বিপুলসংখ্যক উৎসুক মানুষের ভিড় ছিল। এতে ফায়ার সার্ভিস ও সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহের গাড়ি ঘটনাস্থলে যেতে মারাত্মক বিঘ্নের মুখে পড়ে বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা।
সরেজমিন আরও দেখা যায়, হাজার হাজার উৎসুক জনতা ভিড় জমিয়েছেন। তাদের অনেকে মোবাইলে আগুনের ছবি তুলছিলেন এবং ভিডিও ধারণ করেন। কেউ কেউ সেলফিও তুলছিলেন। উৎসুক মানুষের ভিড় এতটাই ছিল যে, তাদের সরাতে শেষ পর্যন্ত সেনাসদস্যদের হস্তক্ষেপ করতে হয়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সেনাবাহিনীর একদল সদস্য বাঁশি বাজিয়ে ও মৃদু লাঠিচার্জ করে তাদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেন। বেলা ১১টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দোকানে ঢুকে ঢুকে তল্লাশি শুরু করে। এ সময় একে একে বেরিয়ে আসছিল পুড়ে ভস্ম হওয়া মাছ-মুরগি, দুধের কৌটা, চাল, ডাল, তেল, আটা, লবণসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য।
গুলশান ১ নম্বর ডিএনসিসি মার্কেটের দোতলা ভবনের পূর্ব পাশ ঘেঁষে লোহার কাঠামোর ওপর টিন দিয়ে গড়ে ওঠা এই কাঁচাবাজারে মাংস ও মাছের দোকানের পাশাপাশি মুদি ও সুগন্ধির দোকান ছিল। অগ্নিকান্ডের পর পোড়া এবং আগুনে সিদ্ধ হয়ে যাওয়া মাছ-মাংস বের করতে দেখা গেছে বহু দোকানিকে। আমদানি করা খাদ্যপণ্য ও প্রসাধনী দোকানের পাশাপাশি প্লাস্টিকের খেলনার দোকানও ছিল কাঁচাবাজারে। সবই পুড়ে ছাই হয়েছে।
ডিএনসিসি পাকা মার্কেট (সুপার মার্কেট) দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এস এম তালাল রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, কাঁচাবাজারের কোনো দোকানই রক্ষা করা যায়নি। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। রাতে সাধারণত দোকানগুলোতে কেউ থাকে না। বাজারের কলাপসিবল গেটে তালা দিয়ে পাহারাদাররাও বাইরেই থাকেন। এ কারণে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে দিনের বেলায় এই আগুন হলে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারত।
কাঁচাবাজারের পুড়ে যাওয়া দোকানের সামনে বসে বুকফাটা আহাজারি করছিলেন সৈয়দা রাবেয়া সুলতানা। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে এই মার্কেটে আগুনে আমার পাঁচটি দোকান পুড়ে যায়। প্রায় ১২ লাখ টাকা ঋণ করে কাঁচাবাজারে আবার পাঁচটি দোকান নিই। সব দোকানে ক্রোকারিজের জিনিসপত্র ছিল। আগুনে সেগুলোও পুড়ে ছাই।’ রাবেয়া সুলতানা বলেন, ‘আমরা ঋণ করে ব্যবসা করি। কীভাবে টাকা পরিশোধ করব বুঝতে পারছি না।’ এই আগুন পরিকল্পিতÑ অভিযোগ করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘প্রতি বছর কেন এখানে আগুন লাগবে?’
কসমেটিকসের দোকানদার রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘২০১৭ সালে যখন আগুন লাগে, তখন ৭৫ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়েছিল। এবার গেল ৩০ লাখ টাকার মাল।’ ব্যবসায়ী শাহ জামান জানান, তার চারটি দোকানের মধ্যে দুটি ভাড়া দিয়েছিলেন। আর দুটির মধ্যে একটিতে তিনি মসলার ও একটিতে কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। মসলার দোকানটি দুই মাস হলো চালু করেছিলেন। তিনি বলেন, ছয় বছর দুবাইয়ে থেকে এসে জমানো টাকা দিয়ে ব্যবসা চালু করেছিলেন। তার দাবি, আগুনে তার ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
আগুন নেভানের পর উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিটের পাশাপাশি আগুন নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরাও কাজ করেন। আগুন নেভানোর জন্য কাঁচাবাজারে কোনো ব্যবস্থা ছিল না। পানির সংকট ছিল। ২০১৭ সালের অগ্নিকান্ডের পর যে সুপারিশ করা হয়েছিল, তা মার্কেট কর্তৃপক্ষ অনুসরণ করেনি। এ ছাড়া মার্কেট কমিটিকে তিন থেকে চার বার সাবধানতা নোটিস দেওয়া হলেও তারা শোধরায়নি। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়া মার্কেট চালাতে নিষেধ করা হয়েছিল। শাকিল নেয়াজ বলেন, ২০১৭ সালে আগুন লেগেছিল, তখন পাশের গুলশান শপিং সেন্টার ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছিল। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় এখনো ভবনটি চলছে। আগুন নেভাতে পানিসংকট দেখা দিলে পাশে গুলশান লেকে পাম্প বসিয়ে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়।
ডিএনসিসি মার্কেটে অগ্নিকান্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আরও যান গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম এবং ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠান ফারুক।
এ সময় রেজাউল করিম বলেন, ‘কোনো দুর্ঘটনাকে আমরা ছোট করে দেখতে চাই না। আমরা গভীরে যেতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘গুলশানের কাঁচাবাজারটি পরিকল্পিত ভবন নয়। ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে স্থাপনা নির্মাণ করে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা করেছে। এখানে বিদ্যুৎসংযোগসহ অন্যান্য ব্যবস্থায় নিয়ম মানা হয়নি। এখানে কিছু বিরোধও আছে। আমরা বিরোধ দূর করার চেষ্টা করছি। কোথাও কোনো অনিয়ম থাকলে অ্যাকশনে যাব।’
হানিফ বলেন, একই জায়গায় দুই বছরের মধ্যে একাধিক অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটল। এটা নাশকতা কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই মার্কেটটি ভেঙে আন্তর্জাতিক মানের শপিং মল করার কথা ছিল। যেকোনো কারণেই হোক, এটা হয়নি। কিন্তু এখন জনগণের স্বার্থেই এটাকে ভেঙে বহুতল মার্কেট তৈরি করতে হবে। যেসব ব্যবসায়ীর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাদের বিষয়ে সিটি করপোরেশন খোঁজখবর নিচ্ছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে মেয়র আতিকুল বলেন, ‘মার্কেটটিতে এর আগে যখন আগুন লাগে তখন অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। এখনো অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা এখানে ডিএনসিসি স্থায়ী মার্কেট করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মামলার জটিলতা আছে। আমরা এই মামলার নিষ্পত্তি করে যত দ্রুত সম্ভব স্থায়ী মার্কেটের দিকে যাব; যেখানে অগ্নিনির্বাপণসহ ব্যবসায়ীদের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা থাকবে।’
তদন্ত কমিটি : আগুন নেভানোর পর ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, ঘটনা তদন্তে উপপরিচালক শামীম হাসানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্ত শেষে আগুনের কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। প্রাথমিকভাবে তারা ধারণা করছেন, কাঁচাবাজারের সুগন্ধির কোনো দোকান থেকে আগুন লেগেছে।
ডিএনসিসির তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা, আইন কর্মকর্তা, সম্পত্তি কর্মকর্তা, নির্বাহী প্রকৌশলী (অঞ্চল-৩) এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একজন প্রতিনিধি। ডিএনসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটিকে পাঁচ দিনে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার গুলশানের অদূরে বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুন লেগে ২৬ জন নিহত ও ৭৪ জন আহত হয়। এর আগে ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় আগুনে পুড়ে মারা যান ৭১ জন ও আহত হন শতাধিক ব্যক্তি।