ফারুক-তাসভির গ্রেপ্তার

তিনজনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মামলা

রাজধানীর বনানীতে ২৩ তলা এফ আর টাওয়ারে আগুনে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় গতকাল শনিবার দায়ের করা মামলায় ভবনের জমির মালিক প্রকৌশলী এস এম এইচ আই ফারুক ও ভবন মালিক সমিতির সভাপতি তাসভির উল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর আগে তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা করেন বনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মিল্টন দত্ত। ফারুক ও তাসভির ছাড়া মামলার নামোল্লেখ করা অপর আসামি হলেন ভবনটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুল।

ডিবির উপকমিশনার (উত্তর) মো. মশিউর রহমান জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল রাত পৌনে ১১টার দিকে গুলশান-২ থেকে তাসভিরকে গ্রেপ্তার করে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়েছে। নকশাবহির্ভূতভাবে কীভাবে তিনি ভবনটি ২৩ তলায় উন্নীত করলেন সে বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। যদিও রাজউক চেয়ারম্যান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ২৩ তলা পর্যন্ত নির্মাণের অনুমোদনের একটি নথি তারা পেয়েছেন।

এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান,  রাত সোয়া ১টার দিকে ফারুককে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।

গ্রেপ্তার হওয়া তাসভির উল ইসলাম বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও কুড়িগ্রাম জেলা সভাপতি। তিনি কাশেম ড্রাইসেলস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নির্বাহী কর্মকর্তা।

এদিকে এফ আর টাওয়ারে আগুনের ঘটনা তদন্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা গতকাল ভবনটি পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শন শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কমিটিপ্রধান বলেছেন, ভবনে হোসপাইপ ছিল। কিন্তু সেটা কার্যকর ছিল না। জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি ছিল অত্যন্ত সরু। একই বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রধানও। গত বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১টায় আগুন লাগার পর বিকেল পৌনে ৫টায় নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। গতকাল তল্লাশি শেষে ভবনটি বনানী থানা-পুলিশকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এফ আর টাওয়ারে যায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত সচিব ফয়জুর রহমানের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের তদন্ত দল। তাদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিপ্রধান সুরক্ষা সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. তরুণ কান্তি শিকদারও ছিলেন। পরিদর্শন শেষে ফয়জুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা শুক্রবারও এসেছিলাম কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করতে পারিনি। শনিবার তদন্ত কমিটির সদস্যরা ভবনটি ঘুরে দেখেছি। ভবনের ৮-১০ তলা সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। ১১ তলা আংশিক পুড়েছে। ১২-১৪ তলা ধোঁয়ায় কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখনো আমরা বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারিনি। ভেতরে কিছু ফ্লোর ঘুরে দেখেছি। কাল (আজ) রবিবার সকাল ১০টা-দুপুর ১২টা পর্যন্ত আমরা এই ভবনে যাদের অফিস ছিল ওইসব অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য শুনব। আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ যেগুলো আছে সেগুলো দেখব।’ তিনি আরও বলেন, ‘পোড়া ভবনের অষ্টম তলায় একটি টেক্সটাইল কোম্পানির অফিস ছিল। সেখানে পোড়া কম্পিউটার, আসবাবপত্র ও কাপড়ের অবশিষ্ট অংশ পড়ে আছে। আর ওপরের তলাগুলোতেও কম্পিউটার, পোড়া আবসাবপত্র, ফলস সিলিংÑ এসব পড়ে থাকতে দেখা গেছে।’

অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘পুড়ে যাওয়া ভবনে হোসপাইপ ও ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার ছিল। কিন্তু সেটা কেউ ছুঁয়ে দেখেনি। আমরা জেনেছি হোসপাইপটি কার্যকর ছিল না।’ ভবনে জরুরি বহির্গমনের সিঁড়িটি প্রশস্ত ছিল না উল্লেখ করে ফয়জুর রহমান বলেন, ‘২৭ থেকে ২৮ ইঞ্চি চওড়া সিঁড়ি এত মানুষের বহির্গমনের জন্য যথেষ্ট ছিল না।’ ৩ এপ্রিলের মধ্যেই প্রতিবেদন দাখিল করা হবে উল্লেখ করে ফয়জুর রহমান বলেন, ‘আমরা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ অধিদপ্তরে ভবনের মালিক, ডেভেলপারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভবনের নকশা, অনুমোদন ও অন্যান্য কাগজপত্র নিয়ে হাজির হতে বলেছি। ভবনের সামনে থাকা পুলিশ কন্ট্রোল রুমে কাল (আজ) সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভবনে যাদের অফিস ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলব।’ তিনি মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে জানান, ভবনের মালিক ও ডেভেলপারের কাছে প্রয়োজনীয় যেসব নথিপত্র চাওয়া হয়েছে তার সব তারা দিতে পারেননি। তাদের কাছে আরও কিছু কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে সেটা কাল (আজ) তারা জমা দেবেন বলে জানিয়েছেন।

ভবনটি ব্যবহার উপযোগী কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেটা নির্ধারণ করবেন। আমাদের কাজ হলো আমরা আগুনের কারণ, ক্ষয়ক্ষতি ও এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড রোধে সুপারিশ করব। আমাদের ৯ সদস্যের কমিটিতে বুয়েট, গণপূর্ত, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধি রয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ও সুরক্ষা সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. তরুণ কান্তি শিকদার ভবন পরিদর্শন শেষে বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে এত প্রাণহানির কিছু কারণ চিহ্নিত করেছি। ভবনের জরুরি বহির্গমন সিঁড়িটা ছিল মাত্র ২৪ ইঞ্চি চওড়া, যা ২৩ তলার একটি বহুতল ভবনের জন্য কোনোভাবেই যথেষ্ট ছিল না। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’

গতকাল বিকেল ৫টার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দুপুরে পুলিশ বাদী হয়ে বনানী থানায় মামলা করেছে।’ তিনি মামলার এজাহারে কী আছে বা আসামি কারা সেটি জানাতে রাজি হননি। এর আগে শুক্রবার বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশের মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী বলেছিলেন, আগুনে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।

গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, সামনে ও পেছনের সড়ক পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে। ভবনে থাকা পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে বেজমেন্টে যেসব গাড়ি আটকা পড়েছে মালিকানা যাচাই করে সেগুলো মালিকদের হাতে দেওয়া হচ্ছে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত ১৭টি গাড়ি হস্তান্তর করা হয়েছে। ভবনের সামনের অংশে একটি স্টিলের ছাউনি তৈরি করা হয়েছে। চারপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার ৩২ কামাল আতাতুর্ক এভিনিউর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে ২৬ জন নিহত ও ৭৪ জন আহত হয়েছে। এ ঘটনার তদন্তে পাঁচটি কমিটি গঠন করেছে সরকারি-বেসরকারি দপ্তর।