টানা দুই মাস বিদেশিদের নিট বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধির পর মার্চে এসে নেতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। এ সময় বিদেশিরা পুঁজিবাজার থেকে ১২৩ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারির শেষার্ধ থেকেই পুঁজিবাজারে টানা দরপতন চলছে। এর মধে বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার হওয়ায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পুঁজিবাজারে অধিকাংশ শেয়ারের দরহ্রাসে সব ধরনের সূচক কমেছে। লেনদেনও তলানিতে নেমে এসেছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন বছরের শুরু থেকেই দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশিদের বিনিয়োগে নিট প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ তলানিতে নেমে এলেও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তালিকাভুক্ত বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ ছিল প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। তবে বিএটিবিসিসহ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি ও ব্যাংকিং খাত থেকে মুনাফা তুলে নেওয়ায় মার্চে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগে ভাটা পড়ে।
ডিএসই সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চে বিদেশিদের মোট লেনদেন ছিল ৮৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে শেয়ার ক্রয় ছিল ৩৭৫ কোটি টাকা। আর বিক্রি করেছেন ৪৯৮ কোটি টাকার শেয়ার। এতে মার্চে তাদের নিট বিনিয়োগ প্রত্যাহার হয় ১২৩ কোটি টাকার। সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার শঙ্কায় গত বছর পুঁজিবাজার থেকে প্রায় ৪৯৩ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেন বিদেশিরা। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বিদেশিরা মোট ২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার লেনদেন করেছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কিনেছেন ১ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকার। বিপরীতে বিক্রি করেছেন ১ হাজার ৮১ কোটি টাকার শেয়ার। এ হিসেবে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) তাদের নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩৭৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ২০০৪ সাল থেকে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। বর্তমানে ডিএসইর মোট লেনদেনের মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ আসে বিদেশিদের শেয়ার কেনাবেচা থেকে। যেটা ভারতে প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি।
২০১৮ সালে বাংলাদেশের সমকক্ষ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বাজে অবস্থা ছিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই)। এ সময় ডিএসইর সূচক কমে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। সেখানে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ভারত ও শ্রীলঙ্কা ৫ থেকে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ মূল্যসূচক হারায়। গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৪৯৩ কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার হয়। যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার বৃদ্ধির কারণে উদীয়মান অর্থনীতির বিভিন্ন দেশ থেকেও বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাহার হয়। এসব দেশ থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের আরেকটি কারণ ছিল স্থানীয় নির্বাচন। বাংলাদেশে নির্বাচন যাওয়ার পর থেকে প্রথম প্রান্তিকে বিদেশিদের নিট বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি রয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০১৮ সালে পুঁজিবাজার সংশোধন হওয়ায় অধিকাংশ শেয়ার দর বিনিয়োগ-অনুকূলে ছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিদেশিরা সে সুযোগে শেয়ার কেনার পরিমাণ বাড়িয়েছেন। ২০১৮ সালে কিছু বিনিয়োগ প্রত্যাহার হলেও ২০১৭ সালে বিদেশিরা ১ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা নিট বিনিয়োগ করেন।
জানা গেছে, দেশের শেয়ারবাজারে যেসব বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে তাদের সিংহভাগই যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর বিনিয়োগ কোম্পানি। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর, দুবাইভিত্তিক কিছু বিনিয়োগ কোম্পানিরও বিনিয়োগ রয়েছে। নর্ডিক দেশগুলোর ব্যবসায়ীদের সমন্বিত বিনিয়োগ কোম্পানি ব্রামার্স অ্যান্ড পার্টনার্স দেশের শেয়ারবাজারে প্রায় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।
জানা গেছে, মার্চে যেসব শেয়ারে বিদেশিদের বিনিয়োগে আগ্রহ ছিল, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- গ্রামীণফোন, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্র্যাক ব্যাংক, আইপিডিসি, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, পাওয়ার গ্রিড, সিটি, ইবিএল, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, রেনাটা, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ও সামিট পাওয়ার লিমিটেড। এর মধ্যে বিদেশিরা সবচেয়ে বেশি লেনদেন করেছেন গ্রামীণফোন, স্কয়ার ফর্মাসিউটিক্যালস ও ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারে। বিপরীতে চলতি বছর বিএটিবিসির শেয়ার প্রায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশিরা এ কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা তুলে নিয়েছেন। এ ছাড়া সিঙ্গারের শেয়ারও বিক্রি করেছে। কাক্সিক্ষত মুনাফা আসায় সাধারণ বীমা কোম্পানির শেয়ারও ছেড়ে দিয়েছেন তারা।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১০ সালের বাজারধসের পরের বছর থেকে বিদেশি বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে। ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিট বিনিয়োগে ইতিবাচক ধারা ছিল। এ সময় টানা সাত বছরে বিদেশিরা ৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা নিট বিনিয়োগ করেছেন। টানা বিনিয়োগের পর ২০১৮ সালে বিনিয়োগ কিছুটা প্রত্যাহার করে নেন তারা। চলতি বছরের শুরুতে তারা নিট বিনিয়োগ করলেও এখন শেয়ার বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এমনিতেই দুই মাস ধরে পুঁজিবাজারে ক্রেতাসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছেন। এ সময় বিদেশিদের শেয়ার বিক্রি পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাবে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।