রাজধানী ঢাকায় নির্মিত আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোর ৬৭ শতাংশেরও বেশি রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন করা নকশা লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হয়েছে। শুধু আগে নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রেই নকশার লঙ্ঘন হয়নি, বর্তমানে নির্মাণকাজ চলছে এমন ভবনগুলোরও প্রায় ৩০ ভাগ অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মাণ করা হচ্ছে। এ তথ্য খোদ রাজউকেরই। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বারিধারা, নিকেতন ও তেজগাঁওতেই ইমারত নির্মাণ বিধি ভঙ্গ করে কমপক্ষে আট হাজার ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। গত দুই বছরে অভিযান চালিয়ে এসব এলাকার নকশাবহির্ভূত ২৩১টি স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে রাজউক।
রাজউকের করা সর্বশেষ এক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রাজউকের আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গমাইল এলাকার মধ্যে মোট দুই লাখ চার হাজার ১০৬টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালের জুলাই মাসের আগে নির্মাণ করা হয়েছে এক লাখ ৯৫ হাজার ৩৭৬টি। এর মধ্যে এক লাখ ৩১ হাজার ৫৮৩টি ভবনে ইমারত নির্মাণ লঙ্ঘনের চিত্র পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। অর্থাৎ, প্রতি ১০০টি ভবনের মধ্যে ৬৭ দশমিক ৩৫টি ভবনই অনুমোদিত নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। কেবল আগে নির্মিত ভবনের ক্ষেত্রেই নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ নয়, এখন নির্মাণ করা হচ্ছে এমন আট হাজার ৭৩০টি ভবনের মধ্যে দুই হাজার ৬০৬টিতে বিধি মানা হচ্ছে না। অর্থাৎ, এখন রাজধানীতে যেসব ভবন নির্মাণ হচ্ছে তার মধ্যে শতকরা ২৯ দশমিক ৮৫ ভাগ অনুমোদিত নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার গতকাল সোমবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজউকের এলাকায় বিপুল পরিমাণ ভবন ইমারত আইন লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়েছে। বিভিন্ন সময় এসব ভবনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছি। এখন নতুন করে বহুতল ভবনের নকশা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছি। এজন্য রাজউকের ২৪টি টিম মাঠে নেমেছ। তাদের দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রথমে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। পরে তালিকা ধরে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’
গত বছরের জুলাই মাসে তৈরি রাজউকের তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, রাজউকের আশুলিয়া-গাজীপুর নিয়ে গঠিতে জোন-১ এ মোট ভবন রয়েছে আট হাজার ৮৭৪টি। রাজউক এরকম আটটি জোন নিয়ে গঠিত। এরমধ্যে নির্মিত ভবন সংখ্যা আট হাজার ৪১৬ আর নির্মাণাধীন ভবন রয়েছে ৪৫৮টি। উত্তরা, টঙ্গী নিয়ে গঠিত জোন-২ এ রয়েছে ৬০ হাজার ১৩৭টি ভবন। এর মধ্যে নির্মিত ভবন সংখ্যা ৫৭ হাজার ৪০১টি, নির্মাণাধীন দুই হাজার ৭৩৬টি। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, পল্লবী এলাকা নিয়ে গঠিত জোন-৩ এ রয়েছে ৫০ হাজার ১১৯টি ভবন। এর মধ্যে ৪৮ হাজার ৭৯১টি নির্মিত ভবন আর ১ হাজার ৩২৮টি নির্মাণাধীন রয়েছে। গুলশান, বারিধারা, নিকেতন, তেজগাঁও এলাকা নিয়ে গঠিত রাজউকের ৪ নম্বর জোনে ভবন রয়েছে ১৫ হাজার ৭৭২টি। এর মধ্যে নির্মিত ভবন সংখ্যা ১৪ হাজার ৭৮৮টি আর নির্মাণাধীন রয়েছে ৯৮৪টি। ধানম-ি-লালমাটিয়া এলাকা নিয়ে গঠিত ৫ নম্বর জোনে রয়েছে ১৭ হাজার ৭১৬টি ভবন। এর মধ্যে নির্মিত ভবন রয়েছে ১৭ হাজার ১৩৮টি আর নির্মাণাধীন রয়েছে ৫৭৮টি। রামপুরা, মতিঝিল ও খিলগাঁও এলাকা নিয়ে গঠিত ৬ নম্বর জোনে মোট ভবন রয়েছে ২১ হাজার ৬৫৬টি। এর মধ্যে নির্মিত ভবন রয়েছে ২১ হাজার ২৪৪টি আর নির্মাণাধীন ভবন হলো ৪১২টি। লালবাগ, সূত্রাপুর, কেরানীগঞ্জ এলাকা নিয়ে গঠিত জোন ৭ নম্বরে রয়েছে ভবন ১০ হাজার ৭০০টি। এর মধ্যে নির্মিত ভবন সংখ্যা ১০ হাজার ১০টি আর নির্মাণাধীন হলো ৬৯০টি। ভুলতা-নারায়ণগঞ্জ এলাকা নিয়ে গঠিত জোন-৮ এ রয়েছে মোট ১৯ হাজার ১৩২টি ভবন। এর মধ্যে নির্মিত ভবন সংখ্যা ১৭ হাজার ৫৮৮টি আর নির্মাণাধীন ১ হাজার ৫৪৪টি।
এ বছরের জানুয়ারিতে তৈরি রাজউকের আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ৮টি জোনে মোট নির্মাণাধীন ভবন সংখ্যা ৮ হাজার ৭৩০টি। এর মধ্যে লে-আউট নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ২ হাজার ৬০৬টি। অর্থাৎ, প্রায় ৩০ শতাংশ ভবন নকশা বহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া পৌরসভা ও অন্যান্য দপ্তর থেকে অনুমোদন নিয়ে এক হাজার ৪৮টি ভবন নির্মাণ হচ্ছে। এসব ভবন নকশা মেনে নির্মাণ করা হচ্ছে কি না, সে তথ্য জানা যায়নি।
রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন দেয় এবং সেই লে-আউট প্ল্যান অনুযায়ী ভবন নির্মাণ হয়েছে কি না, তা পর্যক্ষেবণ করে। সেই পর্যবেক্ষণে ১ নম্বর জোনে ৪২৪টি, ২ নম্বর জোনে ৭৮০টি, ৩ নম্বর জোনে ৩২৮টি, ৪ নম্বর জোনে ১০৫টি, ৫ নম্বর জোনে ৫৫টি, ৬ নম্বর জোনে ৩২৯টি, ৬ নম্বর জোনে ২৩৮টি ও ৮ নম্বর জোনে ৩৪৭টি ভবন নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণাধীন ভবন রয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, দুই কোটিরও মানুষের আবাস ও বাণিজ্যিকস্থল ঢাকাসহ রাজউকের কর্মকা- বিস্তৃত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর পর্যন্ত। বিদ্যমান জনবল দিয়ে বিশাল আয়তনে নির্মিত ও নির্মাণাধীন ভবনগুলোর কর্মযজ্ঞ পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নকশা মেনে ভবন নির্মিত হচ্ছে কি না বা নির্মিত ভবনে নকশা মানা হয়েছে কি না, তা নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান দেশ রূপান্তরকে গতকাল বলেন, ‘আমাদের ৮টি জোনে পরিচালক, অথরাইজড অফিসার, সহকারী অথরাইজড অফিসার, প্রধান ইমারত পরিদর্শক ও ইমারত পরিদর্শক রয়েছেন। তারা নিজ নিজ এলাকায় নতুন ভবনগুলো লে-আউট প্ল্যান অনুযায়ী নির্মিত হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। এটা তাদের রুটিন ওয়ার্ক।’
তিনি বলেন, ‘রাজউকের কর্মপরিধি অনুযায়ী জনবল আরও বাড়ানো প্রয়োজন, এটা সত্য। তবে এই মুহূর্তে আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’