সরে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৬, ০২:৪০ এএম

নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বঙ্গভবনের একাধিক সূত্র বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন।

বঙ্গভবন সূত্র বলছে, সরকারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে তার সুবিধাজনক সময়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের অনুরোধ জানানো হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি পদত্যাগের বিষয়ে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেন।

এদিকে সম্প্রতি লন্ডন থেকে বাইপাস সার্জারি করে দেশে ফিরেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর তিনি দুইবার সিএমইএইচে চিকিৎসা নেন। শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ না থাকায় তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যেতে চাচ্ছেন। অর্থাৎ শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বঙ্গভবনের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্যার পদত্যাগের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এখনো পদত্যাগের তারিখ ঠিক হয়নি। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই পদত্যাগপত্র যথাযথ প্রক্রিয়ায় জমা দেবেন। আমরা এখন ব্যাগ গোছাচ্ছি।’

আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি কমাতে রাষ্ট্রপতির পদে পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি।

জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকার পতনের সময় থেকেই জামায়াত-এনসিপি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেক নেতা রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পক্ষে ছিলেন। তবে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন (ইমপিচমেন্ট) প্রক্রিয়া না চালিয়ে সম্মানজনকভাবে সরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ ছিল। বিএনপিও ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পরবর্তী রাজনৈতিক সংকট এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে তাকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রাষ্ট্রপতি কীভাবে পদত্যাগ করবেন : বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি তার স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে জমা দিয়ে পদত্যাগ করতে পারেন। পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে। যদি সে সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার দায়িত্ব পালন করতে অপারগ হন বা পদটি শূন্য থাকে, তাহলে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী পরবর্তী সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওই সময় ব্যাপক ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সে সময় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধান অনুযায়ী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে শপথবাক্য পাঠ করান, নতুন উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন এবং রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন শেষে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায়ও রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণ করান।

রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সমর্থিত প্রার্থীই নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে এ বিষয়ে এখনো সরকার বা বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ওই বছরের ২৪ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণ, রাজনৈতিক সংকট নিরসন এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে অভিভাবকত্ব প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী দেশে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তিনি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন এবং নতুন সরকারকে শপথ পাঠ করান।

সরকারবিহীন অবস্থায় দেশের ক্রান্তিলগ্নে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে দেশে সহিংসতা রোধ ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টা চালান। পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনি কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশ ও আদেশ জারি করা তার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল।

এদিকে বিগত সময়ের বিতর্কিত ভূমিকা ও নানা বক্তব্যের কারণে তাকে অপসারণের দাবিও বিভিন্ন সময় জোরালো হয়। তবে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করেনি। বরং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তীতে সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রীতি অনুযায়ী ভাষণ দেন তিনি। এতে বিরোধী দল ওয়াক আউট করলেও দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে আলোচনা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত