জেল থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’তে খালেদা

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে গতকাল সোমবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তার চিকিৎসা শুরু হবে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নবগঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা। তারা আরও জানান, গতকাল সোমবার তাকে বিশ্রামে রাখা হয়। এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জেল থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’তে খালেদা সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করে বলেন, বিএসএমএমইউতে খালেদা জিয়ার ভালো চিকিৎসা হবে না। তাই বিএনপি তাকে বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তির দাবি জানিয়ে আসছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএনপি চায় চিকিৎসা শেষেই যেন খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়া হয়।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সাজা হওয়ার দিনই খালেদা জিয়াকে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগারে নেওয়া হয়। গত বছরের ৬ অক্টোবর তাকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। প্রায় এক মাস চিকিৎসা শেষে তাকে আবারও পুরান ঢাকার কারাগারে নেওয়া হয়।

খালেদা জিয়াকে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িবহর গতকাল দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে কারাগার থেকে রওনা হয়। ১৭ মিনিটেই গাড়িবহর হাসপাতালে পৌঁছায়। এ সময় সেখানে ছিলেন হাসপাতালের পরিচালক, মেডিকেল বোর্ড ও কারা কর্তৃপক্ষের সদস্যরা। এরপর তাকে একটি হুইল চেয়ারে বসিয়ে সোজা লিফটে করে ৬২১ নম্বর কেবিনে নেওয়া হয়। এর আগে সকালেই কারাগার থেকে তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কারা কর্তৃপক্ষের একটি গাড়িতে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে আনার আগে আশপাশে নেওয়া হয় কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাহবুবুল ইসলাম সকালে গণমাধ্যমকে জানান, খালেদা জিয়া বিএসএমএমইউতে ভর্তি হতে রাজি হয়েছেন। তাকে যেকোনো সময় কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়া হতে পারে। এরই মধ্যে তার ব্যবহার্য জিনিসপত্র কারাগার থেকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে আনা হবে- এমন খবর পেয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা হাসপাতালে অপেক্ষা করতে থাকেন। তারা খালেদা জিয়াকে দূর থেকে দেখলেও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেননি।

দুপুরে বিএমএমএমইউর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে মাহবুবুল হক খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সাংবাদিকদের বলেন, তার চিকিৎসার জন্য নতুন চিকিৎসা বোর্ড গঠন করা হয়েছে। মেডিকেল বোর্ডের ওপর তার আস্থা আছে বলে জানিয়েছেন খালেদা জিয়া নিজেই।

গত ১০ মার্চ খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে নেওয়ার সব প্রস্ততি থাকলেও নেওয়া হয়নি। হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আবদুল্লাহ আল হারুন সেদিন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও খালেদা জিয়া ভর্তি হতে অস্বীকৃতি জানানোয় কারা কর্তৃপক্ষ তাকে হাসপাতালে আনতে পারেনি।

খালেদা জিয়ার যত অসুখ : বিএনপি চেয়ারপারসন যেসব সমস্যায় ভুগছেন তা তুলে ধরে বিএসএমএমইউর পরিচালক মাহবুবুল হক বলেন, ‘খালেদা জিয়ার হাতে ও পায়ের জয়েন্টে ব্যথা আছে। তার ডায়াবেটিসের মাত্রা কিছুটা বেশি। খাওয়ায় অরুচি আছে; ঘুমও কম হচ্ছে। তিনি নিজে হাঁটাচলা করতে পারেন না। অন্যের সাপোর্ট নিয়ে তাকে হাঁটতে হয়। তার চিকিৎসার জন্য নতুন মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। গত ২৮ মার্চ মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক জিলান মিয়া সরকারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠন করা হয়। বোর্ডকে সহায়তার জন্য খালেদা জিয়ার দুজন ব্যক্তিগত চিকিৎসকও রয়েছেন। তাকে ৬২১ নম্বর কেবিনে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ৬২২ নম্বর কেবিনে তার ব্যক্তিগত লোকজন আছে। তিনি বলেন, হাসপাতালে আনার পর খালেদা জিয়া মেডিকেল বোর্ডের সদস্যদের সামনে বসে কথা বলেছেন। মেডিকেল বোর্ডের কাছ থেকে সুন্দরভাবে চিকিৎসাপত্র নিয়েছেন। বোর্ডের প্রতি ওনার আস্থা আছে। তাকে দেখেছি, উনি হ্যাপি।’

খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার দরকার আছে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে বিএসএমএমইউর পরিচালক বলেন, ‘আমরা এখনো এমন কিছু পাইনি যার জন্য তার বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজন আছে। এখানেই সব চিকিৎসা সম্ভব।’

‘সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে’ : খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে আনার পর দলের নেতাদের তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি অভিযোগ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল তাকে বিশেষায়িত হাসপাতালে সুচিকিৎসার দাবি জানান। বলেন, ‘আমরা এ কথা বারবার বলেছি, তিনি (খালেদা জিয়া) এ হাসপাতালে আসতে চান না। তিনি মনে করেন, এখানে তার চিকিৎসা হয় না। আমরা তাই বারবার বলেছি তাকে বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে। কিন্তু সরকার এ কথায় কোনো কর্ণপাত করেনি। আমরা খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন, শঙ্কিত। তাই দাবি করছি তাকে বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হোক।’ মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেন, গত বছর যখন তাকে হাসপাতাল থেকে ফেরত নেওয়া হয়, তখন ছাড়পত্র ছাড়াই কারাগারে নেওয়া হয়েছে। তারপর থেকে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়নি। খালেদা জিয়াকে জোর করে হাসপাতালে আনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, তারা এ বিষয়ে কিছু জানেন না।

খালেদার জন্য বিএনপির দুদিনের কর্মসূচি : খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর এবার তার আশু রোগমুক্তি কামনায় আজ মঙ্গলবার বিএনপির উদ্যোগে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বাদ আসর দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া আগামীকাল বুধবার দেশব্যাপী সুবিধানুযায়ী খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল বিএনপির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকাসহ সারা দেশের দলের নেতাকর্মীদের নিজ নিজ এলাকার বিএনপির উদ্যোগে দোয়া মাহফিলে অংশ নিতে নেতাকর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।