চকচক করলেই সোনা হয় না

অতিসম্প্রতি জাতীয় এক দৈনিকে ‘মিনিকেট চালের নামে কী খাচ্ছি’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত খবরটি খুবই উদ্বেগের। কিন্তু খবরটিতে অভিযোগের যেমন সত্যতা রয়েছে। তেমনি তথ্য বিভ্রাটও রয়েছে। মূলত প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতেই আজকের লেখার অবতারণা।

খবরটিতে বলা হয়েছে, দেশে ১ হাজার ধরনের ধান উৎপাদন হলেও মিনিকেট নামে কোনো ধান নেই। তাহলে মিনিকেট চাল বাজারে ভোক্তা পর্যায়ে বিপণন হয় কীভাবে? প্রকৃত অর্থে মিনিকেট জাতের ধান থাকলেও গোটা দেশে মিনিকেট ধানের উৎপাদন সেভাবে হয় না। মূলত বগুড়ার নন্দিগ্রাম, নঁওগা, যশোর ও কুষ্টিয়ায় মিনিকেট ধানের চাষাবাদ হয়। যে পরিমাণ মিনিকেট ধান উৎপাদন হয়, তুলনামূলক তার চেয়ে অনেক বেশি মিনিকেট চাল বাজারজাত হয়। সমস্যাটা এখানেই। যেহেতু মিনিকেট ধানের চাষাবাদ কম, সেহেতু অন্যান্য জাতের চিকন ধানের চালকেও মিনিকেট হিসেবে ভোক্তা পর্যায়ে বিপণন করা হচ্ছে। যা ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।

যেহেতু দেশে মিনিকেট নামে চালের কদর ও চাহিদা দুটোই বেশি, সেহেতু চিকন জাতীয় ধান অটোমেটিক চাল কলে প্রসেস করে চাল উৎপাদন করে মিনিকেট নামে বিপণন করা হচ্ছে। চিকন চাল বলতে শুধু মিনিকেটই নয়, অন্যান্য নামেও চিকন চাল বাজারে বিপণন হচ্ছে। তবে উল্লিখিত খবরে অভিযোগ করা হয়েছে, মোটা জাতীয় ধান অটোমেটিক মিলে বেশি সময় ধরে ভিজিয়ে রেখে সিদ্ধ করার পর মোটা চাল মেশিনে ছেঁটে ঘষেমেজে মিনিকেট হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। উক্ত খবরের প্রতিবেদক এ ধরনের তথ্য কোন সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েছেন, তা আমার জানা নেই। তবে, মোটা চাল ছেঁটে মোটা চাল চিকন করা যায় না। এ ধরনের ধারণা মূলত অনুমান-নির্ভর। এ জন্য উক্ত খবরে তথ্য বিভ্রাটের কথা আমি বলেছি।

উল্লেখ্য, ঘষেমেজে চালের উপরিভাগের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে মরা দানামুক্ত চকচকে চাল কীভাবে বাজারে বিপণন করা হচ্ছে, তার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ’১৯ জাতীয় দৈনিক ‘দেশ রূপান্তরে’ ‘চালের পুষ্টিগুণ ও কৃষকের লাভক্ষতি’ শিরোনামে আমার লেখা একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। উক্ত লেখায় আমি বলেছি, মোটা হোক আর চিকন হোক প্রতিটি চালের উপরিভাগে আকড়া যে অংশটুকু থাকে সেটাই চালের পুষ্টি। সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় পুষ্টিমানের গুণাগুণের বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে আধুনিক মেশিনারিজে চাল চকচকে করে অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করছে এবং ব্যবসায়ীরা ভোক্তা পর্যায়ে বিপণন করছে।

এমনকি সরকার প্রতি বছর আমন ও বোরো সংগ্রহ মৌসুমে কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং আপৎকালীন খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে অভ্যন্তরীণভাবে যে চাল সংগ্রহ করছেÑ এ ধরনের বির্নিদেশের চাল তা শুধু মাত্র স্বয়ংক্রিয় চাল কলেই প্রস্তুত করা সম্ভব। ফলে গোটা দেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠা প্রায় ১৪/১৫ হাজার হাসকিং মিল ধ্বংস হয়ে গেছে। সাধারণ ভোক্তারাও এখন চকচকে পুষ্টিহীন চাল কিনে খাচ্ছে। ফলে মেনুয়ালি চাল প্রস্তুতকারী হাসকিং মিলগুলো এখন রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হয়েছে।

অথচ আগে হাসকিং মিলে যে ধান ছাঁটাই হতো, সে সব চালের উপরিভাগের পুষ্টিগুণ নষ্ট হতো না। মানুষ পুষ্টিসমৃদ্ধ চালই কিনে খেতেন। এখন চকচকে যেসব চাল সাধারণ ভোক্তারা কিনে খাচ্ছেন তার শতভাগই পুষ্টিহীন। ফলে চালের উপরিভাগের আবরণে যে ভিটামিন, মিনারেল, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, প্রোটিন ও আঁশ থাকে তা পলিশারে ঘষেমেজে বের করে আনায় চালে এখন শুধু কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণই বেশি থাকে। ফলে এসব চাল ডায়াবেটিস রোগীরা খাওয়ায় সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায়।

অবশ্য দেশের অধিকাংশ সাধারণ ভোক্তারাই জানেন না চকচকে চালের উপরিভাগে পুষ্টিগুণ থাকে না। এ জন্য একদিকে যেমন সরকারকে জনসচেতনতা বাড়াতে প্রচার চালাতে হবেÑ অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে সংগৃহীত চালের শর্তপূরণ মোতাবেক পরিবর্তন করতে হবে। চালে যেন মরা দানা না থাকে তা বাছাইয়ের জন্য কার্লার শর্টার মেশিন ব্যবহার করতে হবে। আবার মান্ধাতা আমলের অ্যাংকেল বার্ক নির্ভর ধান ছাঁটাই মেশিনের ব্যবহার বন্ধ করে উন্নতমানের ‘হাসকার’ ব্যবহার করতে হবে। তাহলে আস্ত চাল ভেঙে যাবে না। কিন্তু পলিশারের ব্যবহার স্বয়ংক্রিয় চাল কল ও হাসকিং মিলে বন্ধ করতে হবে। তাহলে চালের মান ভালো থাকবে এবং চালের পুষ্টিগুণও নষ্ট হবে না।

বলতে দ্বিধা নেই, চকচক করলেই যেমন সোনা হয় না, তেমনি চাল চকচকে করে পুষ্টিগুণও নষ্ট করা হচ্ছে। এ জন্য যত দ্রুত সম্ভব সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না করতে পারলে পুষ্টিহীন চালই ভোক্তাদের পয়সা দিয়ে কিনে খেতে হবে।    

উল্লেখ্য, মূলত সরকার ধানচাষিদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণভাবে ধান ও চাল সংগ্রহ করে থাকে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫-১৬ হাজার চাল কল রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ ভাগই হাসকিং মিল যা আগেই বলেছি। আর অবশিষ্টাংশ অটোমেটিক চাল কল। গোটা দেশে যার সংখ্যা ৫/৬ শতের বেশি হবে না। আর হাতেগোনা অটোমেটিক রাইস মিলে উৎপাদিত চালে দেশের ভোক্তাদের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই জোগান দেওয়া হচ্ছে। ফলে হাসকিং মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এ সংকট নিরসন করতে হলে সকল হাসকিং মিলকে চালু করতে হবে। এ জন্য সরকারকে সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে হাসকিং মিলগুলোকে আধুনিকায়ন করতে হবে। যেমন : অ্যাংগেল বার্ক পদ্ধতি ধান ছাঁটাইয়ের হলারের বদলে উন্নত মানের ‘হাসকার’ সংযোজন করতে হবে।

হাসকিং মিলে ধান ছাঁটাই করে সে চাল কার্লার মর্টার মেশিনে বাছাই করলে চালে আর মরা দানা থাকবে না। অর্থাৎ হাসকিং মিলগুলো চালু হলে আবার ধান কেনা-বেচাতেও অতীতের মতো প্রতিযোগিতা ফিরে আসবে। শুধুমাত্র হাসকিং মিলগুলোকে পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনলে কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্যও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। আর তা না করলে হাতেগোনা গুটিকতক অটোমেটিক রাইস মিলের মালিকরা সিন্ডিকেট করে ধান কিনবে এবং প্রকৃত অর্থে ধানচাষিদের ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। মাঝপথ থেকে এক শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী চাল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানই লাভবান হবে।

আমরা জানি, ক্রেতা কম থাকলে পণ্যের মূল্য বাড়ে না, আর ক্রেতার পরিমাণ বেশি থাকলে সে পণ্যের বাজারমূল্যও বেশি থাকে, এটাই অর্থনীতির সূত্র। এখানে স্পষ্ট, দেশের

কৃষিভিত্তিক ছোট ছোট হাসকিং মিলগুলো সরকারি ভ্রান্তনীতির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। আর হাতেগোনা গুটিকতক স্বয়ংক্রিয় চাল কলের অনুকূলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ায় তাদের অনুকূলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করায় ধানচাষিরা ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

পাঠক মাত্রই লক্ষ করুন, এসব কারণে গত কয়েক বছর ধরে কৃষক ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর লাভবান হচ্ছেন গুটিকতক ব্যবসায়ী। ফলে উপযুক্ত মূল্য না পেয়ে ধানচাষিরা অন্য চাষাবাদের দিকেই ঝুঁকছেন।

অথচ মানুষ বাড়ছে হু হু করে। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিপুল সংখ্যক মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি এখন অনেকাংশেই দেশীয় উৎপাদন দিয়েই মেটানো সম্ভব হচ্ছে। যদি কোনো কারণে ধানের চাষাবাদ কমে আসে, তাহলে আবার চাল আমদানির পরিমাণ বেড়ে যাবে। যা টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কোনোভাবেই শুভ হবে না।

উপসংহারে শুধু এটুকুই বলতে চাই, চাল চকচকে করে পুষ্টিগুণ নষ্ট করবেন না। যেহেতু বাঙালির প্রিয় খাদ্য ভাত। সেই ভাতের চাল পুষ্টিহীন হলে মানুষের শরীরে পুষ্টির অভাব দেখা দেবে। দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে হলে সব ধরনের চাল প্রস্তুতকারী মিলে পলিশারের ব্যবহার বন্ধ করতেই হবে। তা না হলে পুষ্টিহীন চকচকে চাল খেতে হবে। যা মানুষের সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকার জন্য কোনোভাবেই অনুকূল হবে না।