সচিবের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের পর নথি ধামাচাপার অভিযোগ

সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সচিব আবু হেনা মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০১৫ সালে এই আর্থিক অনিয়ম ঘটে। প্রভাব খাটিয়ে মোস্তফা কামাল প্রতিবেদনটি ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিলেন। ডিপিইর একাধিক কর্মকর্তা জানান, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ২০১৫ সালে তদন্ত কমিটি গঠন করে ডিপিই কর্র্তৃপক্ষ। একই বছরের ১৫ অক্টোবর তদন্ত শেষে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা ও তৎকালীন উপপরিচালক হুমায়ুন কবীর। কিন্তু ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো তা ধামাচাপা দেওয়া হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ হলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেনকে নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আকরাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রীর পরবর্তী নির্দেশনা হাতে আসার পর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস নয়। এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিবেদনটি ধামাচাপা দেওয়ার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্নীতির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব আবু হেনা মোস্তফা কামালকে গতকাল সন্ধ্যায় বারবার ফোন করা হলে তিনি তা কেটে দেন। কিছু কিছু সময় তার মোবাইল ফোন বন্ধও পাওয়া গেছে।

প্রকাশিত ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ওই সময়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার ভ্রমণের জন্য দুই দফা টিএ/ডিএ উত্তোলন করেন। একই ব্যক্তি একাধিক স্থান থেকে একই তারিখে সম্মানী, টিএ/ডিএ উত্তোলন করেছেন, যা তার প্রাপ্য অর্থের চেয়ে বেশি। আবার বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রে সব বিমানবন্দরের জন্য একই পরিমাণে টিএ/ডিএ দাবি করেছেন এবং গ্রহণ করেছেন। একই সঙ্গে একই পথে ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রত্যেক স্থান থেকে টিএ/ডিএ গ্রহণ করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে উল্লিখিত স্থানে না গিয়ে বা অনুষ্ঠান শুরুর আগে টিএ/ডিএ উত্তোলন করেছেন। কোনো প্রকার সময়সূচি উল্লেখ না করে ভ্রমণ আদেশ জারি করেছেন এবং ভ্রমণ আদেশ ছাড়া পরিদর্শন ও ভ্রমণ বিল উত্তোলন করেছেন।

একইভাবে অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের আরও ১২ কর্মকর্তা অতিরিক্ত টিএ/ডিএ উত্তোলন করেছেন। এরা হলেন তৎকালীন উপপরিচালক শেখ মো. রায়হান, উপপরিচালক ইফতেখার হোসেন ভুঁইয়া, পরিচালক মিজাউল ইসলাম, আতাউর রহমান, অনুজ কুমার, সোনিয়া আকবর, সহকারী পরিচালক রাজা মিয়া, শিক্ষা অফিসার মাহফুজা বেগম, শামসুননাহার, মো. মজিবুর রহমান, মাহফুজুর রহমান জুয়েল এবং সহ-শিক্ষা অফিসার নজরুল ইসলাম।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও জড়িত। যেমন যশোর পিটিআইয়ের সুপার মো. কামরুজ্জামানের কাছে তথ্য চাইলে টেলিফোনে তিনি তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে অসদাচরণ করেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, রাজশাহী, রংপুর ও বরিশালের উপপরিচালক ও পরিচালক পর্যায়ে ওই সময়ের কর্মকর্তারা জড়িত রয়েছেন বলে জানানো হয়। তদন্ত চলাকালে যশোর ও রাজশাহী পিটিআই থেকে তথ্য দিয়ে কোনো ধরনের সহায়তা করা হয়নি। মাঠ পর্যায়ের সব তথ্য পাওয়া গেলে এই চিত্র আরও ভয়াবহ হতো বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে আবু হেনা মোস্তফা কামালসহ ১২ কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত উত্তোলিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।