ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকারের সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট-বিধ্বংসী (অ্যান্টি সাটেলাইট বা এ-স্যাট) ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সিদ্ধান্তটি সাহসী ও সময়োপযোগী। সাহসী এ জন্য, ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অতীতের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থাকে (সিআইডিও) এবার এটি করার অনুমোদন দিয়েছে। সিদ্ধান্তটি প্রতিষ্ঠিত বৈষম্যমূলক আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির লঙ্ঘন না হলেও, যেহেতু এ ধরনের পদক্ষেপ মহাকাশের সামরিকীকরণ নিয়ে বৈশি^ক উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে পারে, সেহেতু তা বিস্তর ভাবনাচিন্তার পরই করার মতো বিষয়। ভারতকে নিশ্চয়ই চীনের ২০০৭ সালে চালানো এ-স্যাট পরীক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা মাথায় রাখতে হয়েছে। সে বছর চীন মহাকাশে ৮৬৫ কিলোমিটার ওপরে স্যাটেলাইট-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়, যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের সৃষ্টি করে। ওইসব ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান ও ভবিষ্যৎ মহাকাশ কার্যক্রমের জন্য প্রতিবন্ধকস্বরূপ। এ কারণেই তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা পরীক্ষাটি ৩০০ কিলোমিটার ওপরে চালানোর মাধ্যমে আরও বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছি। এতে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পৃথিবীর দিকে পড়ে যাওয়া নিশ্চিত হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটি, তা হলো আমাদের এ পরীক্ষার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া (পাকিস্তান বাদে) বিরূপ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও এর মধ্যে পড়ে। নাসার গবেষকরা ধ্বংসাবশেষ-সংক্রান্ত যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা আমাদের মহাকাশ বিজ্ঞানীরা বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেই নাকচ করে দিয়েছেন। আর একটি মহাকাশ গবেষণা সংস্থার চেয়ে মার্কিন সরকারের প্রতিক্রিয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিজেদের সক্ষমতার নিপুণতা যাচাইয়ের জন্য ‘ফ্লাই-বাই’ পরীক্ষা ও জ্যামিংয়ের বদলে কাইনেটিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আমাদের বিজ্ঞানীরা সঠিক কাজই করেছেন। এতে এ পরীক্ষা নিয়ে আমাদের বিজ্ঞানীদের আর কোনো সংশয় রইল না।
ভারতের পরীক্ষাটি সময়োপযোগীও। নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারতের কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পরিবেশ তুলনামূলকভাবে বেশি অনুকূল, যা পরমাণু পরীক্ষার পরিস্থিতির বিপরীত। তা সম্ভব হয়েছে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত বিষয়ে বোঝাপড়া বৃদ্ধি পাওয়ায়। আমরা যে বলছি আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়, সে বক্তব্যে কোনো খাদ নেই। তবে মূলত চীনকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে যেমন আমরা পরমাণু অস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন করেছি, তেমনি এ-স্যাট প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারত-চীন কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে।
ভারতের প্রতি চীনের যে কৌশলগত বৈরিতা, তার প্রমাণ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে রক্ষা করা। চীন পাকিস্তানে থাকা মাসুদ আজহারকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১২৬৭ কমিটি কর্র্তৃক সন্ত্রাসবাদী ঘোষণা করতে বাধা দিচ্ছে। এ ছাড়া চীন মাসুদ আজহারকে সন্ত্রাসী ঘোষণা এবং ভারতকে নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপের (এনএসজি) সদস্য করার যে বিরোধিতা করছে, ভারত তাতে ক্ষুব্ধ। ভারতের এই প্রতিক্রিয়ায় চীন নাখোশ। দেশটি এখনো ভারতকে রাজনৈতিক বিচারে সমমর্যাদার ভাবতে অনাগ্রহী। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সম্প্রসারণ নিয়ে সাধারণ পরিষদে লিখিত দলিলভিত্তিক আলোচনা অবশেষে শুরু করার ব্যাপারে ভারত যে চেষ্টা করছে, তা-ও নাকচ করে দিতে কূটনৈতিকভাবে অতি সক্রিয় চীন। দুর্বল দেশগুলোর বিরুদ্ধে চীনের দাদাগিরির কৌশল আর তাদের হুমকি হয়ে ওঠা সাইবার সক্ষমতা নিয়ে বৈশি^ক উদ্বেগের কারণেও ভারতের পাল্টা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্র মাসুদ আজহার ইস্যুটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তোলার যে উদ্যোগ বিবেচনা করছে, চীন তাতে নাখোশ। কারণ এতে তার অসততা সবার সামনে প্রকাশ হয়ে যাবে। চীনের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয়ভাবে তিক্ততা সৃষ্টি হবে, এমন একটি উদ্যোগ থেকে বিরত থাকতে ভারত যে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের ওপর প্রভাব খাটায়নি, তাতে (ভারতে) চীনের পক্ষে সাফাই গাওয়া লোকজন হয়তো নারাজ হবে। তারা এ অদ্ভুত যুক্তি দেন, মাসুদ আজহার, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার (লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল-এলএসি) ব্যাখ্যা ও এনএসজি সদস্যপদ দিয়ে ভারতের প্রকাশ্যে এত তৎপর হওয়া উচিত হয়নি, কারণ এগুলো এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, যার জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে পরীক্ষার মুখে ফেলতে হবে।
ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসের ব্যাপারে চীন যদি কঠোর অবস্থান না নেয় (তারা এমনকি মুম্বাই হামলার নিন্দা করেনি), আমাদের এনএসজি সদস্যপদের বিরুদ্ধে ভেটো দেয় আর ১৯৯৬ সালে সম্মত হলেও এলএসির ব্যাখ্যা বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তন করে তাহলে সম্পর্কের পরীক্ষার আর কী থাকল? আলোচনার গোপনীয়তা সত্ত্বেও ‘বিশেষ প্রতিনিধি’ পদ্ধতি কোনো ফল দেয়নি। ভারতে চীনা লবি যুক্তি দেয়, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত পরমাণু চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবেই চীন পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে ভারসাম্য বজায় রাখছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর কীভাবে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তির প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা বোধগম্য নয়। চীন বিশ^জুড়ে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে যে বিশাল সিল্করোড কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে, তার সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই কীভাবে তা-ও আমাদের মাথায় ঢোকে না। চীন প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছে, ২০৪৯ সাল নাগাদ তারা বিশ^ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকতে চায়। ওই চীনা লবির ভাবনা অনুযায়ী, ভারতের উচিত চীনের স্পর্শকাতরতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তারা যে পর্যন্ত বিরক্ত না হয়, ভারতীয় স্বার্থ-সংক্রান্ত কার্যকলাপ সে পর্যন্ত সীমিত রাখা।
শেষে বলতে হয়, ‘এ-স্যাট’ পরীক্ষা ছিল সময়োপযোগী কারণ, মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা রোধবিষয়ক চুক্তির (প্যারোস) আলোচনা নিশ্চয়ই আগে আর পরে সম্পন্ন হতে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে মতান্তরের কারণে এ আলোচনা থমকে রয়েছে। ‘এ-স্যাট’ প্রযুক্তি আবার অ্যান্টি ব্যালিস্টিক মিসাইল (এবিএম) প্রযুক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এ বিষয়টি নিরাপত্তাগত দিক থেকে প্যারোস চুক্তির আলোচনাকে জটিলতর করেছে। ভারতকে এবিএম প্রযুক্তির পাশাপাশি নন-কাইনেটিক ‘এ-স্যাট’ প্রযুক্তি গড়ে তুলতে আরও কাজ করতে হবে। চীনও এ নিয়ে কাজ করছে। ‘এ-স্যাট’ পরীক্ষা চালানোর মাধ্যমে ভারত সময়মতো পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা না করার ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে পেরেছে। ভারত এখন মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক আইন তৈরির ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হবে।
এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখলে বলতে হয়, সাধারণ নির্বাচনের আগে আগে ভারতের ‘এ-স্যাট’ পরীক্ষা করা আর ভোটে ক্ষমতাসীন দলের কিছু বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টিকে তত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই।
লেখক : ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব
হিন্দুস্তান টাইমস থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ