পরীক্ষার হল থেকে ছাদে নিয়ে ছাত্রীকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা

সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে সম্প্রতি যে ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা হয়েছে এবার তাকেই গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, গতকাল শনিবার আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় অধ্যক্ষ সিরাজেরই অনুসারীরা। এতে গুরুতর দগ্ধ নুসরাত জাহান রাফিকে (১৮) ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার শরীরের ৭৫ শতাংশই পুড়ে গেছে।

আলোচিত এ ঘটনা নিয়ে মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের কেউ কথা বলতে রাজি হননি। স্বজনরা বলছেন, মামলাটি তুলতে অস্বীকৃতি জানানোয় এ ঘটনা ঘটিয়েছে অধ্যক্ষ সিরাজের অনুসারীরা। এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তারা। ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে এলাকাবাসীও। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক আবছার উদ্দিন ও রাফির সহপাঠী আরিফুল ইসলামকে আটক করেছে পুলিশ। সোনাগাজী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত  গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। জড়িতদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অভিযোগ রয়েছে, সোনাগাজী পৌরসভার চরচান্দিয়া গ্রামের একেএম মুসার মেয়ে রাফিকে গত ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। তখন রাফি বিষয়টি পরিবারকে জানালে তার মা সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় সেদিনই গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি আছেন অধ্যক্ষ সিরাজ।

দগ্ধ রাফির ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান দেশ রূপান্তরকে জানান, ২৭ মার্চের আগেও অধ্যক্ষ সিরাজ একাধিকবার তাকে যৌন হেনস্তার চেষ্টা করেন। অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তারের পর থেকে তার লোকজন মামলা তুলে নিতে তাদের পরিবারকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিয়ে আসছিল। তিনি বলেন, ‘সকালে রাফি আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় যায়। তখন অধ্যক্ষের সমর্থক এক ছাত্রী তার (রাফির) বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারছে বলে রাফিকে ছাদে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে কাপড় দিয়ে মুখ বাঁধা আরও চার-পাঁচ ছাত্রী অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নিতে রাফিকে চাপ দেয়। অস্বীকৃতি জানালে তারা রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। রাফির চিৎকারে পুলিশ ও অন্য শিক্ষার্থীরা গিয়ে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়। পরে তাকে ফেনী সদর হাসাপাতালে পাঠানো হয়।’ রাফির অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয় বলে জানান হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) আবু তাহের ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘রাফির শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।’

রাফির গায়ে আগুন দেওয়ার সময় সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে উপস্থিত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নুরুল আমিন বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি মাদ্রাসার অফিস কক্ষে বসে হলে প্রশ্নপত্র পাঠানোর কাজ করছিলাম। হঠাৎ চিৎকার শুনে বেরিয়ে এসে দগ্ধ অবস্থায় এক ছাত্রীকে দেখতে পেয়ে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাই।’

স্থানীয়রা জানান, গত ২৭ মার্চ যৌন হয়রানির অভিযোগে অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় দুটি পক্ষ তৈরি হয়। মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন এবং সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুর রহমান অধ্যক্ষের পক্ষে অবস্থান নেন। তারা তার মুক্তির দাবিতে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের একটা অংশ নিয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। অন্যদিকে স্থানীয় কাউন্সিলর শেখ আবদুল হালিম মামুনের উদ্যোগে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একটি অংশ অধ্যক্ষের বিচার দাবিতে মানববন্ধন করেন। এই নিয়ে এলাকায় চাপা উত্তেজনা চলছিল। অধ্যক্ষের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে রুহুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তখন আমি মাদ্রাসাকে সচল রাখার স্বার্থে অবস্থান নিয়েছি। কিন্তু এভাবে একজন ছাত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। এ ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’

বার্ন ইউনিটে মৃত্যুশয্যায় রাফি : রাফিকে গতকাল বিকেল ৩টার দিকে ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের জরুরি বিভাগে আনা হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাকে নেওয়া হয় আইসিইউতে। বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তার অবস্থা খুবই খারাপ; শরীরের ৭৫ ভাগ পুড়ে গেছে। তবে শ্বাসনালি পোড়েনি। সে কথা বলতে পারছে।’ আগুন লাগাতে কোন ধরনের দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তার শরীর থেকে কেরোসিনের গন্ধ পেয়েছি। তবে অন্য কোনো দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে কি না সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন।’

গতকাল বিকেলে বার্ন ইউনিটের জরুরি বিভাগের সামনে মেঝেতে পাটি পেতে শুয়ে ছিলেন দগ্ধ রাফির মা শিরিন আক্তার। পাশেই বসা ছিলেন খালাত বোন শিউলি আক্তার। তার বড়ভাই নোমান ও ছোটভাই রায়হান এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছিলেন। মা শিরিন আক্তার চোখের পানি মুুছতে মুছতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই বছর ধরে মেয়েকে উত্ত্যক্ত করছিল ওই শিক্ষক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এমন নৃশংস অবস্থার সৃষ্টি হবে ভাবতেও পারিনি। আমি এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। যেন আর কাউকে এমন পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়।’ খালাত বোন শিউলি আক্তার বলেন, ‘আমি ওই মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পরীক্ষা দিয়েছি। ওই অধ্যক্ষ অনেক ছাত্রীর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে। কিন্তু কেউ ভয়ে মুখ খোলেনি। রাফি প্রতিবাদ করায় তাকে আগুন দিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।’ রাফির ছোটভাই একই মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্র রাশেদুল হাসান রায়হান বলেন, ‘যৌন হয়রানির অভিযোগে করা মামলার কারণে অধ্যক্ষ সিরাজের পক্ষের কয়েক ছাত্রী রাফিকে মাদ্রাসার তৃতীয় তলার ছাদে ডেকে নিয়ে মামলা প্রত্যাহারের চাপ দেয়। রাজি না হওয়াতে ওর গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা।’