দলীয় প্রতীকে চলমান উপজেলা নির্বাচন ঘিরে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়া তৃণমূল আওয়ামী লীগে শৃঙ্খলা ফেরাতে শোকজের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানিয়ে বলেন, গত শুক্রবার বৈঠকে উপজেলা নির্বাচন ঘিরে দলের যেসব সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন- তাদের শোকজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত দলে শৃঙ্খলা ফেরাতেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী ফোরাম। কেন্দ্রীয় ওই নেতারা আরও বলেন, এটি একধরনের রাজনৈতিক কৌশল। শোকজ তেমন কোনো শাস্তি নয়। তৃণমূলের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে এর বিকল্প কোনো উপায় নেই কেন্দ্রের হাতে।
সভাপতিমন্ডলীর দুই সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেসব সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী দলীয় প্রার্থীর বিরোধিতা করে শৃঙ্খলা নষ্ট করেছেন তাদের হুঁশিয়ার করতেই শোকজ। এর মধ্য দিয়ে তাদের চাপে রাখা হলো। সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য বলেন, যাদের শোকজ করা হবে তাদের একটি তালিকা দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার দপ্তরে পাঠাবেন, তারপরই শোকজের চিঠি পাঠানো শুরু হবে।
আওয়ামী লীগের দপ্তর থেকে প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যমতে, প্রথম চার ধাপের উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে কাজ করেছেন প্রায় ৪০ জন সংসদ সদস্য। এর মধ্যে দুজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রীরও সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। এ ব্যাপারে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ না থাকলে তৃণমূলে দলাদলির আশঙ্কা আরও বেড়ে যাবে। পরিস্থিতির যাতে অবনতি না হয় সে জন্য শোকজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কেন্দ্র থেকে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, শোকজের পর অভিযুক্তদের জবাব পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এখন বলা যাবে কারা শাস্তি পাচ্ছেন, কারা পাচ্ছেন না। শোকজ কি শাস্তি এ প্রশ্নে তিনি বলেন, এটাও এক ধরনের শাস্তি। সতর্ক করা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব কর্মকান্ডে যারা নিকট অতীতে জড়িত ছিলেন, তাদের কাউকেই বহিষ্কার করা হয়নি দল থেকে। বিভিন্ন সময়ে শোকজ নোটিস করা হয়েছে। নিকট অতীতে দলে বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে মাত্র একটি তাও ভিন্ন একটি ইস্যুতে। দলের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে বহিষ্কার করা হয় হজ নিয়ে ‘আপত্তিকর মন্তব্যের জন্য’। এ ছাড়া বহিষ্কারের ঘটনা নেই বললেই চলে। কেন্দ্রের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা শোকজ পর্যন্তই।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে ঢাকার লালবাগের একটি আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয় ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে। তাকে চ্যালেঞ্জ করে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ওই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তৎকালীন অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজি মো. সেলিম। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে পরাজিত করে জিতেও যান হাজি সেলিম। কিন্তু তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে ফরিদপুরের একটি আসনেও আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রকাশ করে বিজয়ী হন এক তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা। সর্বশেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনেও ওই আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন জাফর উল্যাহ। কিন্তু শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে অথবা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রকাশের কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হন দলের অনেকে। ওই নির্বাচনে সারা দেশে অনেকের প্রাণহানি হয়; যাদের বেশির ভাগই দলীয় নেতাকর্মী। সে সময়েও শোকজেই সীমাবদ্ধ ছিল শাস্তি। কোনো কোনো জেলা কমিটি তাদের অধীন নেতাদের বহিষ্কার করলেও কেন্দ্র কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। সর্বশেষ গণভবনে অনুষ্ঠিত তৃণমূলের বর্ধিত সভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বহিষ্কার নিয়ম অনুযায়ী হয়নি বলে জানান। বলেন, বহিষ্কারের ক্ষমতা একমাত্র কেন্দ্রের।
নিকট অতীতে কাউকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, যে নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন হয় তাকে শোকজ করার পর জবাব সন্তোষজনক হয়েছে মনে হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। তাই নিকট অতীতে কারও বিরুদ্ধে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেন, কোন কোন নেতাকে শোকজ করা হবে সে তালিকা এখনো হয়নি। অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই চলছে। সত্যতা নিশ্চিত করে খুব শিগগির শোকজ করা হবে।
আওয়ামী লীগের ওই কেন্দ্রীয় নেতারা আরও বলেন, শোকজকে এখন গুরুত্ব দেয় না তৃণমূলের নেতারা। তারা মনে করেন, শোকজের উপযুক্ত জবাব দেওয়া গেলেই মাফ পাওয়া যায়। শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধের দায়ে দু-একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গেলে এমন অপরাধ কমত।