রাজধানী ঢাকাসহ দেশে ফিটনেসবিহীন গাড়ি থেকেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকের লাইসেন্স থাকে না অথবা মোটরসাইকেল-জাতীয় যানের লাইসেন্স নিয়ে বাস-ট্রাকের মতো ভারী গাড়ি চালানো হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট শাখা, হাইওয়ে পুলিশ ও থানা পুলিশের তদন্তে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্ঘটনা কমাতে হলে সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া হালকা যানবাহনের লাইসেন্স নিয়ে কোনো অবস্থাতেই ভারী গাড়ি চালানো যাবে না।
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার কেওচিয়া ইউনিয়নের খুনী বটতলা এলাকার কিবিএম ব্রিকফ্রিল্ডের পাশে বাসচাপায় নিহত হন মোটরসাইকেল আরোহী দিদারুল আলম। দুর্ঘটনার পর পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা অঞ্চলের চট্টগ্রাম সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন বিষয়টি তদন্ত করেন। তদন্তে জানা গেছে, ওই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হানিফ পরিবহনের বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর ও ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ ২০ নভেম্বর ২০১৪ সালে শেষ হয়েছে। প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে ফিটনেসবিহীন বাসটি চলছিল ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার রুটে। চালক মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্স নিয়ে ওই বাসটি চালাচ্ছিলেন। বাসটির রুট পারমিটও ছিল না।
একই দিন সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় বাসচাপায় নিহত হন তিনজন। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার কামরুল আমিন স্বাক্ষরিত তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ওই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বাসটির ফিটনেস ছিল না।
গত ১৯ মার্চ রাজধানীর নদ্দা এলাকায় সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। ওই বাসটিরও ফিটনেস ছিল না। এর আগে গত ১ জানুয়ারি মালিবাগে সুপ্রভাত পরিবহনের বাসচাপায় পোশাককর্মী নাহিদা পারভীন পলি ও মীম আক্তার নিহত হন। হাতিরঝিল থানা পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, ওই বাসটিরও ফিটনেস এবং চালকের লাইসেন্স ছিল না।
পুলিশ সদর দপ্তরের ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট শাখা বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত করে। এতে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী গাড়িগুলোর ফিটনেস ছিল না। চালকরা লাইসেন্স ছাড়াই বা হালকা যানের লাইসেন্স নিয়ে ভারী গাড়ি চালাচ্ছিল। এ বিষয়ে ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মিয়াজী মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর আমরা তদন্ত করে দেখেছি অধিকাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ফিটনেসবিহীন গাড়ি। এ ছাড়া চালকরা মোটরসাইকেল-জাতীয় হালকা গাড়ির লাইসেন্স নিয়ে ভারী গাড়ি চালায়। যার ফলে এত দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস করতে হলে ফিটনেসবিহীন বাস চালানো বন্ধ করতে হবে।’
এ বিষয়ে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভাপতি ও সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামালে গাড়ির বিরুদ্ধে মামলার পাশাপাশি ডাম্পিংসহ বিভিন্ন শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ছাড়া সড়ক অবকাঠামো ঠিক করা, হালকা লাইসেন্স নিয়ে ভারী গাড়ি না চালানো, বাস বা ট্রাকের ছাদে যাত্রী পরিবহন করলে গাড়ি ডাম্পিং করার কথা বলা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কাজ করার জন্য আমরা জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের পক্ষ থেকে একটি অথরিটি (কর্র্তৃপক্ষ) গঠনের কথা বলেছি। সেটা টাস্কফোর্স বা অন্য যেকোনো নামে হোক।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফিটনেসবিহীন গাড়ি দুর্ঘটনাকবলিত হলে মৃত্যু সংখ্যা বাড়ে ও ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। আর মোটরসাইকেলের লাইসেন্স নিয়ে প্রাইভেটকার, প্রাইভেটকারের লাইসেন্স নিয়ে বাস-ট্রাক চালানোর ঘটনাও অনেক। আমাদের যত সংখ্যক ভারি গাড়ি আছে তত সংখ্যক চালক নেই। এসব গাড়ি কেউ না কেউ অবৈধভাবে চালাচ্ছে। এ বিষয়গুলো দেখা দরকার পুলিশের। এসব গাড়ি ও চালকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি এসব চালককে কীভাবে প্রশিক্ষিত করে ভারী গাড়ি চালানোর উপযোগী করা যায় সে বিষয়েও কাজ করা দরকার।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ খান বলেন, ‘আমাদের সমিতির পক্ষ থেকে কঠোরভাবে বলা আছে যে ফিটনেসবিহীন বা নিয়ম অমান্য করে কোনো গাড়ি চালানো যাবে না। আমরা সকল নিয়ম ও আইন মেনে চলার পক্ষে। লং রুটে বা হাইওয়েতে ফিটনেসবিহীন গাড়ি কম চলে, রাজধানী বা শহরের ভেতর বেশি চলে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু ফিটনেসবিহীন গাড়ি বা চালক দায়ী বলা ঠিক হবে না। এর সঙ্গে আরও অনেক কারণ জড়িত থাকে। সেগুলোরও প্রতিকার হওয়া দরকার। আমরা সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভাপতি শাজাহান খানের নেতৃত্বে সড়ক দুর্ঘটনারোধে ১১১ দফা সুপারিশ করেছি। এগুলো বাস্তবায়ন হলে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করি।’