প্রায় দুই সপ্তাহ আগে রাজধানীর নয়াপল্টনে ভিআইপি রোডের ফুটপাতের চা-দোকানি খোকনের কাছে সাদা পোশাকে পুলিশের একটি দল আসে। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে গত বছর ১৪ নভেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বোমা হামলা, গাড়িতে আগুন ও পুলিশকে মারধরের মামলায় তাকে সাক্ষী হতে বলে তারা। খোকন অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দরকার হলে দোকানদারিই করুম না; কিন্তু মিথ্যা কোনো সাক্ষী দিবার পারুম না।’ খোকনের মতো আরও অনেকের কাছে গিয়েই পুলিশ নাশকতার মামলায় সাক্ষী হওয়ার অনুরোধ করছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কেউই সাক্ষী দিতে রাজি হচ্ছেন না। দেশ রূপান্তরের সরেজমিন অনুসন্ধানে এসব তথ্য মিলেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নয়াপল্টনের ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনসহ দণ্ডবিধির জামিন অযোগ্য বিভিন্ন ধারায় তিনটি মামলা করে পুলিশ। এর মধ্যে পল্টন থানায় গত ১৫ নভেম্বর উপপরিদর্শক (এসআই) আল-আমিনের করা ২২ নম্বর মামলায় মির্জা আব্বাস, রুহুল কবির রিজভী, আফরোজা আব্বাস, নবীউল্লাহ নবী, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানসহ বিএনপি ও ছাত্রদলের ১৫৯ জন নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় পরিকল্পিতভাবে বেআইনি জনসমাবেশ ঘটিয়ে মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাস্তায় দাঙ্গা, ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি কাজে বাধা, হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ ও ইটপাটকেল-ককটেল নিক্ষেপ করে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যকে মারাত্মক জখম করা, পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়ে ক্ষতিসাধন করা সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়; এতে ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা। একই দিন পল্টন থানার ২১ নম্বর মামলায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে ১৯২ জনের নামোল্লেখ ছাড়াও অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করেন এসআই সোমেন কুমার বড়–য়া। মামলাটির জব্দ তালিকায় তিনজনকে সাক্ষী করা হয়। তাদের একজন চামেলীবাগের কলেজছাত্র মোস্তাফিজুর রহমান (২০) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পল্টন আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি কাজী ভাইয়ার নির্দেশে আমি সেখানে যাই। কিসে সই করেছি আমার ঠিক মনে নাই। আমি কোনো মামলার সাক্ষী বা অন্য কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাই না। এসব ঝামেলায় জড়ালে আমার লেখাপড়ার ক্ষতি হবে। আমি এখন কী করব বুঝতে পারছি না। আমার পরিবারকেও বিষয়টি জানাইনি।’ একই মামলার আরেক সাক্ষী নয়াপল্টনের আবুল হাসনাত হৃদয় (২৪) বলেন, ‘আমি সই করেছি। কিন্তু সেখানে কী লেখা ছিল আমি জানি না।’
২২ নম্বর মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেন পল্টন থানার এসআই আশরাফুল আলম। তিনি জানান, মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই তথ্য জানিয়েছেন ২১ নম্বর মামলটির তদন্ত কর্মকর্তা একই থানার এসআই সুজন কুমার তালুকদার।
সাক্ষী খুঁজে না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবির তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার তদন্তে সম্ভাব্য সাক্ষীদের খুঁজে বের করা হচ্ছে। অনেকে ঝামেলা মনে করে সাক্ষী দিতে রাজি হয় না। তারপরও পুলিশ চেষ্টা করছে, সাক্ষী খুঁজে করার চেষ্টা চলছে। চার্জশিটে সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়ে সেটা অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। তাছাড়া মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দিতে গেলেও কিছু সাক্ষী ও প্রয়োজনীয় দলিলাদি আদালতে দাখিলের প্রয়োজন হয়। না হলে আদালত এসব ফাইনাল রিপোর্ট গ্রহণ না-ও করতে পারে। এ কারণে এসব মামলা নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা উভয় সংকটে পড়েছেন।’
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর সারা দেশে নাশকতার মামলা হয়েছে ১ হাজার ৮৩২টি; এর মধ্যে পুলিশের ওপর হামলার মামলা ৪২৫টি। শুধু ঢাকা মহানগরীতেই ২০১৮ সালে পুলিশ হামলার শিকার হয়েছে ২২৯ বার; আর চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১৩৩ বার ও ঢাকা রেঞ্জে ১১০ বার। একই সময়ে বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে ঢাকা মহানগরীতে ৩২৮টি মামলা হয়েছে; তাছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরীতে ১৩০, ঢাকা রেঞ্জে ৫৬, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৮২, খুলনা রেঞ্জে ১৭১ এবং রাজশাহী রেঞ্জে ৮৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় বিএনপি-জামায়াতের অন্তত ১৫ হাজার নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। মামলাগুলোর তদন্তে নেমে সাক্ষীর অভাবে এখন হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ।
গত বছর ২৪ সেপ্টেম্বর গুলশান ও বনানী এলাকার ৫০ বিএনপি নেতাকর্মীর নামোল্লেখ করে বনানী থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইন ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনসহ জামিন অযোগ্য বিভিন্ন ধারায় মামলা করেন এসআই আবদুল মালেক। মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছেন এসআই শরিফুল ইসলাম। তদন্তের সবশেষ অবস্থা জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রয়োজনীয় সাক্ষী খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। সাক্ষীর অভাবে মামলাটির তদন্তে আশানুরূপ অগ্রগতি নেই।’
গত বছর ১৮ নভেম্বর বিএনপি-জামায়াত ও সহযোগী সংগঠনের ১৪৫ নেতাকর্মীকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেন ৬নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য গাজী রফিক। তিনি জানান, ‘আমি সব আসামিকে চিনি না। পুলিশ আটক কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব নাম দিয়েছে। আমি শুধু সই করেছি। শুরুর দিকে পুলিশ একটু খোঁজখবর নিয়েছে, এখন আর নেয় না।’ অচেনা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নাশকতার মামলার সাক্ষী খুঁজে না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘এসব মামলা কীভাবে হয়েছে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ সেটা ভালো বলতে পারবে।’ এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘ডিএমপিতে কোনো ভুয়া মামলা হয়েছে কি না তা খুঁজে বের করতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভুয়া মামলায় কেউ আসামি হয়ে থাকলে তাকে মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান বলেন, ‘পুলিশের করা নাশকতার মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। বিদায়ী বছরটিতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও নির্বাচনের আগে বিরোধী মতের লোকজনকে চাপে রাখা ও কারাগারে নেওয়ার কৌশল হিসেবে এসব মামলা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি, মৃত ব্যক্তি বা প্রবাসীদের নামেও নাশকতার মামলা হয়েছে; অনেক ক্ষেত্রে গায়েবি বা মিথ্যা মামলা হয়েছে। ফলে এসব মামলায় সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’