আইন সংশোধন না করেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে করার কথা ভাবছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দলটির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে এ ভাবনার কথা জানিয়ে কারণ হিসেবে বলেন, বর্তমান আইনে উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান দলীয় প্রতীকেই করার কথা থাকলেও তা উন্মুক্ত রেখে ভালো ফল পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, এ দুটি পদে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। তাই আগামীতে ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনের সব পদেই নির্দলীয় ভোট চান তারা। এজন্য দলের আইনজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।
তবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এক মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল মঙ্গলবার টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইন পরিবর্তন না করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় করা হলে আইনের স্পিরিটে খানিকটা আঘাত করবে। নির্দলীয় নির্বাচন করতে হলে আইন সংশোধনই শ্রেয়। তিনি
বলেন, আইন সংশোধন করলে সমালোচনা হতে পারে এমনটা ভেবে আইন পরিবর্তন না করেই নির্দলীয় নির্বাচন কীভাবে করা যায় সেদিকে বেশি চিন্তা করছে সরকার।
আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর দুই সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের আপত্তির মুখে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠানের আইন মাত্র চার বছর আগে সংসদে পাস করা হয়েছে। এখনই এ আইন বাতিল করলে নানামুখী সমালোচনা হতে পারে, যা সরকারের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। আবার নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থিতার সুযোগ রয়েছে। কাজেই আইন রেখেই যদি নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন করার সুযোগ থাকে এবং আইনের কোনো ব্যত্যয় না ঘটে তাহলে আইন সংশোধন হবে না এটা প্রায় চূড়ান্ত। ওই দুই নেতা জানান, আইন থাকলেও নির্বাচন আগের মতো নির্দলীয় হলে সমস্যা তৈরি হবে কি না তা দেখতে আইনজীবীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এ ধরনের পদ্ধতি আছে কি না তাও দেখতে বলা হয়েছে। তবে আগামী এক-দেড় বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের বড় কোনো নির্বাচন না থাকায় কিছুটা সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে এগুচ্ছেন বলে তারা জানান।
আওয়ামী লীগের ওই কেন্দ্রীয় নেতারা বলেন, চলমান উপজেলা নির্বাচনে গোপালগঞ্জে সব উপজেলায় চেয়ারম্যান পদ থেকে শুরু করে সব পদেই নির্বাচন উন্মুক্ত রাখা হয়। এটিকে এক ধরনের ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে দেখা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে নির্বাচনগুলো জাঁকজমক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন জমজমাট করতে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে এই নির্দলীয় ভোটের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি অনেক দূর এগিয়েছে। এর পক্ষে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।
আওয়ামী লীগ সম্পাদকম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, গোপালগঞ্জে উন্মুক্ত নির্বাচন করা একধরনের ‘টেস্ট কেস’। ভবিষ্যতে স্থানীয় নির্বাচনগুলো এরকমই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। সভাপতিম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনে যা আছে তাই থাকবে; নির্বাচন হবে উন্মুক্ত আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত এটাই হতে পারে।
আওয়ামী লীগের অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বহাল রেখে ভিন্ন কোনো প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের চিন্তাও রয়েছে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত দলগুলোর যে প্রতীক রয়েছে তার বাইরের প্রতীক পছন্দ করতে হবে দলীয় প্রার্থীকে। এক্ষেত্রে ইসির থেকে দলগুলোর আলাদা নিবন্ধন নেওয়ার বিধান হতে পারে বা বিদ্যমান নিবন্ধনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আলাদা প্রতীক নির্ধারণ হতে পারে। এই বিধানে জাতীয় দলগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক দলগুলোও চাইলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের স্বার্থে ইসি থেকে নিবন্ধন নিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনে আছে দলীয় প্রতীকে হতে হবে। কিন্তু দল যদি মনে করে আমি কোনো প্রার্থীকে প্রতীক বরাদ্দ দেব না তাতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না। তিনি বলেন, ব্যাপারটি হলো এমন যে আপনার কাছে লাইসেন্স করা অস্ত্র আছে, কিন্তু আপনি তা ব্যবহার করবেন না। এতে কি আইনের ব্যত্যয় ঘটবে? সচিব বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি মনে করে, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করবে না তা তারা পারবে।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর সদস্য সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কীভাবে হবে দলীয়ভাবে না নির্দলীয়, সেটা দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে। এ নিয়ে কংক্রিট কোনো সিদ্ধান্ত এখনো আমাদের দলে হয়নি। এই আইনজীবী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়ার আইন থাকলেও নির্দলীয় হলে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটবে কি না সে বিষয়ে আরও জানার আছে। সভাপতিম-লীর আরেক সদস্য ফারুক খান বলেন, আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো কোন প্রক্রিয়ায় হবে তা এখনো ঠিক হয়নি। তবে দলের সর্বোচ্চ ফোরামে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।