শিক্ষার সঙ্গে নিরাপত্তা জরুরি

নিজের বাড়ির পর শিশুদের নিরাপদ ও প্রিয় স্থানগুলোর মধ্যে বিদ্যালয় অন্যতম। বিদ্যালয় যদি অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে তবে এর চেয়ে উদ্বেগের সংবাদ আর কী হতে পারে। সম্প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের একাধিক সংবাদ আমাদের সামনে আসছে। গত মঙ্গলবার ক্লাস চলাকালে বরগুনার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাদ ধসে পড়েছে। এর আগে গত শনিবার একই জেলার তালতলীর ছোটবগী পিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গ্রেড বিম ধসে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মানসুরা নিহত হয়।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অতি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে সারা দেশে এমন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। আর জরাজীর্ণ বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। বলা হচ্ছে, নির্মাণের পর আর কোনো সংস্কারের ছোঁয়া লাগেনি অনেক বিদ্যালয় ভবনে। এমনকি ১০ বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষিত বিদ্যালয়েও চলছে পাঠদান এ অবস্থাকে শুধু উদ্বেগজনক বললে কমই বলা হয়।

অভিযোগ আছে, দেশের অনেক বিদ্যালয় ভবন নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে তৈরি।  সরকারি কাজের ঠিকাদারি নিয়ে বেশি লাভের আশায় অনেকেই যথাযথভাবে ভবন নির্মাণ করেন না। উপজেলা-জেলা পর্যায়ের প্রকৌশল অফিসের সঙ্গেও থাকে অসৎ ঠিকাদারের যোগসাজশ। অধিক লাভের আশায় নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার করে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের কারণে অতিদ্রুত এগুলোতে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অনেক বিদ্যালয় ভবনে ফাটলের চিহ্ন এবং ব্যবহারে অনুপযুক্ত, যা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে পড়তে পারে।  ঘটতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা।

শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে এমন অবহেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনেক ভবনই শিশু উপযোগী তো নয়ই, বরং জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থা চলতে পারে না। এ কথা সত্য, রাতারাতি ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয়গুলো সংস্কার কিংবা নতুন বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগত বিষয়াদির বাইরেও রয়েছে আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতা। কিন্তু শত শত শিক্ষার্থীর জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্ন যেখানে জড়িত, সেখানে কোনো প্রকার অজুহাত কিংবা দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নেই।  অতএব, সম্ভাব্য সব ধরনের দুর্যোগ-দুর্বিপাকের আশঙ্কাকে বিবেচনায় রেখে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবে খোলা মাঠে পরীক্ষা গ্রহণ ও পাঠদানের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। তাও কোনো সমাধান নয়। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো সংস্কার অথবা নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। সংস্কারকার্য বা নির্মাণকাজ চলাকালে যাতে কোনোভাবেই শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত না হয় সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

মানসুরা নিহত হওয়ার ঘটনায় ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবন চিহ্নিতের নির্দেশ দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই নির্দেশনায় ১৫ দিনের মধ্যে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করতে বলা হয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের। পরবর্তী পদক্ষেপগুলোও দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করতে হবে।

দেশের বিভিন্ন জনপদে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারবিহীন বিদ্যালয় ভবনগুলোর ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিতে হবে। পুরনো ভবন সংস্কারের পাশাপাশি নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগও জরুরি।  পুরনো ভবন সংস্কার এবং নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে যাতে অবহেলা ও নয়-ছয় না হয়, সেদিকেও কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। খোদ বিদ্যালয় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ রেখে কোনো শিক্ষা উদ্যোগই ফলপ্রসূ হতে পারে না। বিদ্যালয় ভবন সংস্কার ও নির্মাণে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও বেসরকারি সংস্থাও এগিয়ে আসতে পারে।

শিক্ষার পরিবেশ নির্বিঘœ করতে সবার আগে শিক্ষার্থীদের বসার স্থান নিরাপদ করতে হবে।  একটি শ্রেণিকক্ষে বসে শিক্ষার্থীরা যদি সারাক্ষণ প্রাণের শঙ্কায় থাকে, তাহলে তাদের পক্ষে স্বাভাবিক মনঃসংযোগ নিয়ে লেখাপড়ার কাজ চালিয়ে যাওয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে এভাবে ক্লাস করার মধ্য দিয়ে দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে অনেক প্রতিষ্ঠান।  শিল্প খাত থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিটি ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো, একটি দুর্ঘটনা ঘটার পরে সবার টনক নড়ে। এক্ষেত্রে পাঠদানে ব্যবহৃত শ্রেণিকক্ষের এ দৈন্যদশা এক অশনি সংকেত হিসেবেই উপস্থিত হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে হবে এখনই। ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলো সারিয়ে তুলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে এখনই।