দীর্ঘ প্রায় সাত দশকের রাষ্ট্রহীনতার গ্লানি এখন ইতিহাস। ৫১টি ছিটমহলের কয়েক হাজার মানুষ এখন পুরোদস্তুর ভারতের নাগরিক। তাদেরই একাংশ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের সামনে দাঁড়িয়ে। আজ বৃহস্পতিবার দেশের সরকার গঠনের লক্ষ্যে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চলেছেন তারা। মাসাধিককাল নির্বাচন পর্বের প্রথম দফায় উত্তরবঙ্গের দুই সংসদীয় কেন্দ্র কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারে ভোট। অথচ কোচবিহার জেলার দিনহাটায় ছিটমহলবাসীর অস্থায়ী শিবিরে প্রায় ৮৫টি পরিবারের ভোট নিয়ে কোনো হেলদোল নেই। তারা একসময় ছিলেন বাংলাদেশি ছিটমহলের অধিবাসী, রাষ্ট্রহীন মানুষ। ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে ভারত-বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী ছিটমহল হস্তান্তরের পর তারা ভারতীয় নাগরিকের মর্যাদা পেয়েছেন। কিন্তু এইটুকুই কি সব ভোটের আবহে ফের উঠে আসছে সে প্রশ্ন। দিনহাটার সাবেক ছিটমহলবাসী মোহাম্মদ তাহের অকপটেই স্বীকার করলেন, ‘ভোটের আগে বিভিন্ন দলের বাবু-বিবিদের আনাগোনা লেগেই আছে ঠিকই। কিন্তু ভোট নিয়ে আমাদের বড় একটা মাথাব্যথা নেই।’ বছর তিনেক আগে ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর যে স্বপ্নগুলো ডানা মেলতে শুরু করেছিল, তা ক্রমশই ফিকে হয়ে আসছে। এই আক্ষেপ এখন অনেকের মুখেই। তাদের একজন বলেন, ‘ভেবেছিলাম ভারতে আমরা ঘর পাব, জমি পাব, চাকরি পাব। কিন্তু এখনো মেলেনি কিছুই।’
দিনহাটা, হলদিবাড়ি ও মেখলিগঞ্জের তিনটি অস্থায়ী আবাসিক শিবিরে সব মিলিয়ে প্রায় হাজার খানেক সাবেক ছিটমহলবাসীর আপাত বসবাস। এর মধ্যে অবশ্য দিনহাটা শিবিরটিই পড়ছে কোচবিহার সংসদীয় কেন্দ্রে। আর আছে বেশ কয়েকটি সাবেক ছিটমহল গ্রাম। সব মিলিয়ে ভোটার প্রায় হাজার দশেক। হলদিবাড়ি ও মেখলিগঞ্জ শিবির দুটি অবশ্য জলপাইগুড়ি সংসদীয় কেন্দ্রের অন্তর্গত, ভোট যেখানে দ্বিতীয় দফায়, ১৮ এপ্রিল।
এবারই প্রথম নয়, ২০১৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনেও প্রবল উৎসাহে ভোট দিয়েছেন তারা। কোচবিহারের নব্য ভারতীয় নাগরিকরা অবশ্য ভোট দিয়েছেন ওই কেন্দ্রের তৎকালীন সাংসদ রেনুকা সিনহার মৃত্যুর পর উপনির্বাচনেও। তবে এবারের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের গরিমা ভিন্নতর, অনন্য। দেশের সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় এবার তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে ১৯৭৭ সাল থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ছিল বামফ্রন্ট শরিক ফরোয়ার্ড ব্লকের একচ্ছত্র আধিপত্য। তাল কাটের ২০১৪ সালের নির্বাচনে। ফরোয়ার্ড ব্লকের কাছ থেকে কোচবিহার ছিনিয়ে নেয় রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। এ নির্বাচনে সবাইকে অবাক করে দ্বিতীয় স্থান দখল করে বিজেপি। তারা ভোট পায় ২৮ শতাংশ। ফরোয়ার্ড ব্লক তৃতীয় স্থানে থাকলেও তাদের প্রাপ্ত ভোট নেমে আসে ৬.৪৯ শতাংশে।
এবার তৃণমূল প্রার্থী করেছে ফরোয়ার্ড ব্লক ভেঙে বেরিয়ে আসা তথা সাবেক বাম সরকারের মন্ত্রী পরেশ অধিকারীকে। বিজেপিও ওই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে আরেক দলছুট প্রাক্তন যুব তৃণমূল নেতা নিশিথ প্রামাণিককে। কোচবিহারে ফরোয়ার্ড ব্লক ও কংগ্রেসের হয়ে ভোটে লড়ছেন গোবিন্দ রায় ও পিয়া রায়চৌধুরী। তবে মূল লড়াইটা যে তৃণমূল বনাম কংগ্রেস, সে কথা একবাক্যে মানছেন রাজনৈতিক পণ্ডিতরা। অন্য কেন্দ্র আলিপুরদুয়ারেও মূল ব্যাটল লাইনটা একই। তৃণমূলের দশরথ তিরকে বনাম বিজেপির জন বার্লা।
উত্তরবঙ্গে প্রচারে ঝাঁপিয়েছেন কেন্দ্র ও রাজ্যের দুই শাসক দলের মহারথীরা। একদিকে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ এবং অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। উত্তরবঙ্গে এরইমধ্যে একাধিক সভা করেছেন তারা। একাধিকবারই উঠে এসেছে সাবেক ছিটমহলবাসীর প্রসঙ্গ। ছিটমহলবাসীদের ‘আচ্ছে দিন’ আনার কর্র্তৃত্ব দাবি করেছে উভয় শিবিরই। তবে আচ্ছে দিনের সূর্যোদয়ের দাবিতে যতই সরগরম হোক না কেন ভোটের বাজার, দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রহীন এ মানুষগুলোর মুখে প্রকৃত অর্থে হাসি ফোটেনি এখনো। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের এই সন্ধিক্ষণেও ভোটের দামাল হাওয়া থমকে আছে তাদের আঙিনার ধারে।