নরসিংদীতে ৪ নারীকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টায় মামলা

নরসিংদীর রায়পুরার উত্তর বাখরনগর ইউনিয়নের লোচনপুর গ্রামে ঘরে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে তিন বোনসহ এক পরিবারের চার নারীকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে থানায় মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামি গতকাল বুধবার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বলে রায়পুরা থানার ওসি মহসিনুল কবির জানিয়েছেন।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল দুপুরে দগ্ধ তিন কিশোরীর বড় বোন রত্না আক্তার বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সাতজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও চারজনের বিরুদ্ধে রায়পুরা থানায় মামলা করেন। আসামিদের মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত ওই গ্রামের মৃত দুলাল গাজীর দুই ছেলে মাহমুদুল হাসান রবিন (২৬) ও মৃত সোহরাব মিয়ার ছেলে মামুন মিয়া (১৯) ঘটনার বিষয়ে অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম শামীমা আক্তারের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

বাকি আসামিরা হলেন মাহমুদুলের ছোট ভাই সুমন মিয়া (২০), মৃত ফজলু মিয়ার ছেলে শিপন মিয়া (৩৫), মৃত মান্নান মিয়ার ছেলে কাজল মিয়া (৪০), মৃত ইদ্রিস মিয়ার ছেলে আল-আমিন (২৮) ও মোসলেহ উদ্দিনের ছেলে লোকমান হোসেন (২০)। তাদের সকলের বাড়ি উপজেলার উত্তর বাখরনগর ইউনিয়নের লোচনপুর গ্রামে।

রায়পুরা থানার পরিদর্শক দেব দুলাল দে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আসামিদের সঙ্গে দগ্ধ নারীদের পরিবারের বিরোধ চলে আসছিল। এরই জের ধরে মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টায় তাদের ঘরে কেরোসিন ও পেট্রল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ওই সময় তারা ঘরের কলাপসিবল গেটে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেয়। আগুনে পুড়তে থাকলে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। পরে তারা স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় ভাঙা জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।

অগ্নিদগ্ধরা হলো লোচনপুর গ্রামের মৃত সামসুল মিয়ার মেয়ে প্রীতি (১১), সুইটি (১৩), মুক্তামণি (১৬) এবং তাদের ফুপু খাতুন নেছা (৬৫)। দগ্ধ তিন বোনের মধ্যে মুক্তামণি এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। সুইটি স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে এবং প্রীতি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। এদের মধ্যে মুক্তামণির শরীরের ১০ শতাংশ, সুইটির ১৫ শতাংশ, প্রীতির ১৫ শতাংশ এবং খাতুন নেছার শরীরের ১২ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের প্রত্যেকেরই কমবেশি শ্বাসনালি পুড়েছে। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন আছেন।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানায়, ৬ ফেব্রুয়ারি উত্তর বাখরনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি গাজী আবদুল মান্নানের ছেলে শাহাদাত হোসেন ওরফে দুলাল গাজীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় তা ছেলে মাহমুদুল হাসান রবিন বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করে। ওই মামলায় সামসুলের দুই ছেলে সোহাগ ও বিপ্লব মিয়াকে আসামি করার পর তাদের বাড়িতে হামলা হয়; দরজা-জানালা ভেঙে ফেলা হয় বাড়ির। তখন থেকে বাড়ির লোকজন এলাকাছাড়া হওয়ায় বাড়িটি পরিত্যক্ত ছিল। কিছুদিন আগে আদালত থেকে বিপ্লব জামিনে মুক্ত হলে গত সোমবার বাড়িতে ফেরেন পরিবারের সদস্যরা। পরদিন ভোরে তাদের বাড়িতে আগুন দেওয়া হলে বিপ্লবের তিন বোন ও ফুপু দগ্ধ হয়।

এ ঘটনায় হত্যাচেষ্টা মামলার বাদী রতœা সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা আমার বোন ও ফুপুকে পেট্রল ও কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে মারতে এই হামলা চালিয়েছে। অল্পের জন্য তারা বেঁচে গেলেও হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর লড়াই করছে। তারা হামলা করেই ক্ষান্ত হয়নি, আমাদের বাড়ি-ঘরে যেতে দিচ্ছে না। আমরা তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। মূলত জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেই এই ঘটনা ঘটেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ঘটনায় সম্পৃক্তদের পরিচয় পেয়েছি। তাদেরকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।’