দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠন সংক্রান্ত পুরনো নোটিফিকেশনটি আবার কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে থাকা যেসব কোম্পানি এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত রয়েছে, সেসব কোম্পানির কার্যক্রম পর্যালোচনার জন্য ২০০২ সালের এক নোটিফিকেশন সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দাখিলের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে কমিশন।
গতকাল বিএসইসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম খায়রুল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ৬৮২তম কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সভা শেষে নির্বাহী পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএসইসি জানায়, কমিশনের পরিচালক মো. মনসুর রহমান হবেন কমিটির আহ্বায়ক, উপপরিচালক শেখ মো. লুৎফুল কবির সদস্য ও উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম সদস্য সচিব। তারা ২০০২ সালের নোটিফিকেশনটি পর্যালোচনা করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কমিশনকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবেন।
উল্লেখ্য, শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ পর্ষদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ২০০২ সালের ১ আগস্ট ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠন সংক্রান্ত নোটিফিকেশনটি জারি করে তৎকালীন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। সেখানে বলা হয়েছিল, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জে এক বছরের বেশি সময় ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে থাকলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে এর পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য নোটিফিকেশন জারির ছয় মাসের মধ্যে শেয়ারহোল্ডারদের বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) করে, সেখানে উদ্যোক্তাপক্ষ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সমন্বয়ে নতুন করে পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটিতে যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া নিছক ব্যক্তির বদল করে পুনর্গঠিত পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ উদ্যোক্তাদের হাতেই ন্যস্ত রাখার পথ রুদ্ধ করতেও উক্ত নোটিফিকেশনে বেশ কিছু বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছিল। উদ্যোক্তাদের নিকটাত্মীয়, কোম্পানির নিরীক্ষক বা পরামর্শক, বড় গ্রাহক বা সরবরাহকারী প্রাতিষ্ঠানিক বা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি হিসেবে পর্ষদে আসতে পারবেন না। সেখানে আরও বলা হয়েছিল, উদ্যোক্তারা কোম্পানির অন্তত ৫০ শতাংশ শেয়ারের মালিক না হলে পুনর্গঠিত পর্ষদের চেয়ারম্যান পদে তাদের কাউকে রাখা যাবে না।
নোটিফিকেশনে আরও বলা হয়, সব পক্ষের সমন্বয়ে নতুন পর্ষদ গঠনের ছয় মাসের মধ্যে কোম্পানির পরিচালন ও আর্থিক ব্যর্থতার কারণগুলো শনাক্ত করতে হবে পর্ষদকে। ব্যর্থতার জন্য কোম্পানির কোনো কর্মকর্তা, পরিচালক বা নিরীক্ষক দায়ী হলে তাদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপও নিতে হবে। এরপর কোম্পানিকে লাভজনকভাবে চালানোর একটি বিশদ কর্মপরিকল্পনা সম্বলিত পরিচালকম-লীর প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। পর্ষদ পুনর্গঠনের সাত মাসের মধ্যে শেয়ারহোল্ডারদের সাধারণ সভা করে এ পরিকল্পনার অনুমোদন নিতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও এক্সচেঞ্জকে এসব বিষয়ে যথাযথভাবে অবহিত করতে হবে।
পর্ষদ পুনর্গঠনের ২৪ মাসের মধ্যে কোম্পানির পরিচালন ও আর্থিক অবস্থার উন্নতি দেখাতে না পারলে কর্তৃপক্ষ কোম্পানির অবসায়ন বা অন্য কোনো কোম্পানির সঙ্গে একীভূতকরণের আইনসম্মত উদ্যোগ নেবে। ২৪ মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর তিন মাসের মধ্যে ইজিএম করে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন চাইতে হবে। সবকিছু বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে পর্ষদের ওপর।
প্রসঙ্গত, ২০০২ সালের নোটিফিকেশনটি জারির পর মোনা ফুড ইন্ডাস্ট্রি নামের একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির পর্ষদ ভেঙে তা কার্যকর করা হয়েছিল। ব্যর্থ উদ্যোক্তাদের সরিয়ে আলী জামান নামের একজন বিনিয়োগকারীকে কোম্পানির পর্ষদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তবে সে কোম্পানিটি বর্তমানে স্টক এক্সচেঞ্জের ওভার দ্য কাউন্টার মার্কেটে রয়েছে। এরপর নিলয় সিমেন্ট নামের একটি কোম্পানিতেও একই চেষ্টা হয়, শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তারা কোম্পানিটিকে তালিকাচ্যুত করে নেন।
সে সময় বেশ কয়েকটি ব্যর্থ কোম্পানির উদোক্তারা কমিশনের নোটিফিকেশনকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট করেছিলেন, কয়েক বছর পর যেটি খারিজ হয়ে যায়। যদিও পরবর্তীতে এ নোটিফিকেশনটি কার্যকর করার চেষ্টা করেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
সাম্প্রতিক সময়ে স্টক এক্সচেঞ্জে বেশ কয়েকটি উৎপাদন বন্ধ, লোকসানি ও দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ তাদের ক্ষমতাবলে দুটি কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করে। পরবর্তী সময়ে আরও চারটি কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তা অনুমোদনের জন্য বিএসইসিতে মতামত চেয়ে পাঠায়। কিছু কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করার বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতামত চায় তারা। যদিও তালিকাচ্যুতির বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ উদ্যোক্তাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ প্রক্রিয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন। এমন পরিস্থিতিতে কমিশন কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠন সম্পর্কিত পুরনো নোটিফিকেশনটি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয়।
লভ্যাংশ না দেওয়া, সময়মতো বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) না করা কিংবা ছয় মাসের বেশি পরিচালন কার্যক্রমে না থাকার মতো কারণ ঘটলে স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ তাদের নিয়ম অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেয়। এর ফলে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে থাকা কোম্পানিটির শেয়ারের লেনদেন নিষ্পত্তির জন্য নয় কার্যদিবস অপেক্ষা করতে হয়। যদিও অন্য সব শেয়ার কেনার তিন কার্যদিবসের মধ্যে বিক্রয় উপযোগী হয়। এ ছাড়া ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ার কেনাবেচায় কোনো মার্জিন ঋণ নিতে পারেন না বিনিয়োগকারী। বর্তমানে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৪১টি কোম্পানি রয়েছে।