সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণ

মাঠ প্রশাসনের যথেচ্ছাচারে হচ্ছে না শতাধিক ভবন

সরকারপ্রণীত নীতিমালা মানছে না খোদ সরকারের মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তারা। ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণের স্থান নির্ধারণ সংক্রান্ত পরিপত্র না মানার কারণে শতাধিক ভবনের নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি। কোথাও প্রস্তাবিত স্থানে জমি নেই আবার কোথাও অন্য সংস্থার জমির ওপর দেওয়া হয়েছে অনুমোদন। এ ছাড়া জনগুরুত্ব উপেক্ষা করে প্রভাবিত হয়ে স্থান নির্ধারণ করায় বেশকিছু মামলাও ঠুকে দিয়েছে সংক্ষুব্ধরা। এসব কারণে সরকারের ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার’ নামের এ প্রকল্পটি বারবার হোঁচট খাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব (ইউনিয়ন পরিষদ শাখা) ইফতেখার আহম্মেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার আন্তরিকভাবে দেশের সব ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণ করতে কাজ করে যাচ্ছে। বেশিরভাগ ইউনিয়ন পরিষদে এ কমপ্লেক্স নির্মাণ শেষ হয়েছে। আশা করছি, বাকিগুলো কমপ্লেক্স নির্মাণকাজও দ্রুত শেষ করতে পারব।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এক ছাদের নিচে সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করতেই একটি অত্যাধুনিক কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হচ্ছে। এখানে বেশ কিছু ভবনের কাজ আমরা মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় আটকে গেছি। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা মোকাবিলা করা হচ্ছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অতিরিক্ত সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থান নির্ধারণের জন্য সরকার ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর একটি পরিপত্র জারি করে। সেখানে ভবন নির্মাণের জন্য কী কী বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তা নির্ধারণের জন্য গাইডলাইন দেওয়া আছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন মহলের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জনগুরুত্বের কথা চিন্তা না করে স্থান নির্ধারণ করেন। ফলে সংক্ষুব্ধ লোকজন আদালতের আশ্রয় নিলে অনেক ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আসছে। আবার আমরা প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়ার পর ঠিকাদার সেখানে কাজ করতে গিয়ে জমিই পাচ্ছে না। এসব কারণে সরকার উন্নয়ন যাত্রা হোঁচট খাচ্ছে।’

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নির্মাণের ক্ষেত্রে জটিলতা এড়ানোর জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর একটি পরিপত্র জারি করা হয়। এ পরিপত্রে বলা হয়, তৃণমূল জনগণকে ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ দেওয়ার লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ২৫ শতাংশ জমি, ইউনিয়নের কেন্দ্রস্থল হওয়া, যাতায়াত ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত সুবিধাসহ অপেক্ষাকৃত উঁচু জমি ও নদীভাঙন ও বন্যামুক্ত হতে হবে। এছাড়া প্রস্তাবিত জমি অব্যশই সহকারী কমিশনারের (ভূমি) মাধ্যমে নিষ্কণ্টকতা যাচাই করতে হবে। পরিপত্রের আলোকে এ কাজের সঙ্গে সহকারী কমিশনার ভূমি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপপরিচালক (ডিডি-এলজি) স্থানীয় সরকার ও জেলা প্রশাসকের সম্পৃক্ততা থাকে।

কয়েকটি ঘটনার কথা তুলে ধরে তারা জানান, কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক ইউনিয়ন পরিষদের স্থান নির্বাচন করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠান জেলা প্রশাসক। প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ২০১০ সালের ১৮ জানুয়ারি ভবন নির্মাণের প্রশাসনিক অনুমোদন দেয় মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রকল্প কর্মকর্তার পক্ষ থেকে কার্যাদেশ দেওয়ার পর আজ পর্যন্ত সেখানে কাজ শুরু করতে পারেনি ঠিকাদার। কারণ, যে স্থানটি ভবন নির্মাণের জন্য জেলা প্রশাসক নির্ধারণ করেছে সেটি স্থানীয় টাইমবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি। ফরিদপুর ভাঙ্গা উপজেলার চন্দ্রা ইউনিয়নের ভবন নির্মাণের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৪ সালের ২০ নভেম্বর। কিন্তু জমি ভবন নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত জমি না পাওয়ায় আজও কাজ শুরু করতে পারেনি। অথচ ভবন নির্মাণের জন্য নীতিমালা অনুযায়ী মহানগরের বাইরে এক দাগে ২৫ শতাংশ নিষ্কণ্টক জমি প্রয়োজন হয়। এ বিষয়টি আমলেই নেয়নি তৎকালীন জেলা প্রশাসন।

খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার উল্টাছড়ি ইউনিয়নের ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু জমি সংক্রান্ত জটিলতায় দরপত্র প্রক্রিয়ায় যেতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার ৬নং টেংড়া ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৪ সালের ২৭ মার্চ। কিন্তু প্রয়োজনীয় জমি না থাকায় আজও ভবন নির্মাণ শুরুই করা যায়নি। মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ী উপজেলার দিঘিরপাড় ইউনিয়নের ভবন নির্মাণের অনুমোদন পায় ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর। জেলা প্রশাসকের প্রস্তাবিত জায়গায় ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পাকা বসতবাড়ির ইমারতসহ ২০ ফুট গভীর পুকুর রয়েছে। নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার মশিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৭ সালের ৩ জুলাই। সেখানে জেলা প্রশাসনের প্রস্তাব দেওয়া জায়গাটি সরকারি আরেকটি সংস্থার বলে দাবি করায় নির্মাণকাজ শুরু করা যায়নি।

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বেতমোড় রাজপাড়া ইউনিয়নের ভবন নির্মাণের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১২ সালের ২৮ জুন। সেখানে জেলা প্রশাসনের নির্বাচিত স্থানটি স্থানীয় বলেশ^র নদীর তীরের হওয়ায় ভবন নির্মাণ থেকে পিছু হটেন সংশ্লিষ্টরা। রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার মাইনিমুখ ইউনিয়ন ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয় ২০০৪ সালে। এরপর থেকে সেখানে সরকারি দুটি সংস্থার জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতায় জড়িয়ে গেলে আর ভবন নির্মাণ সম্ভব হয়নি। শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার কু-েরচর ইউনিয়নের ভবন নির্মাণের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয় পদ্মা নদীর তীরে। ফলে ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়ার পরও গত ছয় বছরে কাজ শুরু করতে পারেনি। ২০০২ সালের ৭ জুলাই কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের ভবন নির্মাণের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু ঠিকাদার কাজ শুরু করতে গিয়ে দেখেন, ইউনিয়ন পরিষদের নামে কোনো জমিই নেই। ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার গালিমপুর ইউনিয়নের ভবন নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয় ২০০১ সালের ২৬ জুন। এছাড়া মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় দেশের শতাধিক ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণের কাজ আটকে গেছে বলে জানা যায়।

স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সারা দেশে মোট ৪ হাজার ৫৭১টি ইউনিয়ন পরিষদ ভবন রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ১৯৯৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪৮৭টি পরিষদে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এ পর্যায়ে এর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৭৫৫ দশমিক ৬৮ কোটি টাকা। ২০১২ থেকে ২০১৯ সালের এ পর্যায়ে ৯০৫ দশমিক ৬০ কোটি ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ৭৫৬টি আর নির্মাণাধীন রয়েছে ২৭৫টি। তৃতীয় পর্যায়ে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৪ হাজার ৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ১৩৩টি ভবন নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে জেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্প থেকে নির্মাণ করা হয়েছে ৯৫৫টি।