বেসিক ব্যাংকের আরেক ঋণ জালিয়াতি

সেলিম ও হেমায়েত হাতিয়ে নিয়েছে ৭৬ কোটি টাকা

ঋণ বিতরণের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য কুখ্যাতি পাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের আরেকটি জালিয়াতি ধরা পড়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে এবার বেরিয়ে এসেছে ব্যাংকের গুলশান শাখার সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হেমায়েতউদ্দিন তালুকদার ওরফে হেমায়েত (৪৫) ও টেকনো ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কামাল হোসাইন ওরফে সেলিমের (৪৬) যোগসাজশে ৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনা।

এ ঘটনায় অ্যাডভান্সড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক (লজিস্টিক) মশিহুর রহমান সরকার ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলা করেন। মামলার তদন্তভার পান দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম। হেমায়েত ও সেলিমকে গত বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচা থেকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আসামিদের জেলহাজতে পাঠিয়েছে আদালত।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে আসামিদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পাশাপাশি তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব নেওয়া হবে।

এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বেসিক ব্যাংকের তিন শাখা গুলশান, শান্তিনগর ও মতিঝিল থেকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। এছাড়া বেসিক ব্যাংকের নিজস্ব তদন্তে আরও ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ পায়।

দুদক উপপরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম দেশ রূপান্তরকে জানান, বেসিক ব্যাংকের ৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সেলিম ও হেমায়েতের বিরুদ্ধে করা মামলাটির তদন্তে দেখা যায়, ২০১২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ব্যাংকের গুলশান শাখা ঋণদাতা হিসেবে টেকনো ডিজাইন ও অ্যাডভান্সড ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই করে। চুক্তি অনুযায়ী, ২৪০টি ফ্ল্যাট বেসিক ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখে অ্যাডভান্সড। ঋণমঞ্জুরির শর্তানুসারে ঋণের ৮০ কোটি টাকা সরাসরি বন্ধকদাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডভান্সড ডেভেলপমেন্টকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, ব্যবসায়ী সেলিম ও ব্যাংক কর্মকর্তা হেমায়েত পরস্পরের যোগসাজশে ২০১৩ সালের ১০ মার্চ থেকে ১৭ জুনের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা অ্যাডভান্সডের অ্যাকাউন্টে না দিয়ে নিজেদের ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন। পরে তারা এসব টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাৎ করেন, যা ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ  আইনের ৫(২) ধারা ও দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, আসামি সেলিম অত্যন্ত ধুরন্ধর প্রকৃতির লোক। তিনি নিজেকে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা বলে পরিচয় দেন। কিন্তু তার স্থায়ী ঠিকানা দেওয়া হয়েছে রাজধানীর নিউ জুরাইন এলাকার ৩১২ নম্বর বাড়ি। সেলিমের অফিস গুলশান-২-এর ২৪ নম্বর সড়কের সিডব্লিউএসবি-১৮-এর এ-১ ফ্ল্যাটে। আর বাসা গুলশানের ১১৩ নম্বর সড়কের ১ নম্বর বাড়ির এ-৪/ডি-৫ ফ্ল্যাটে। এছাড়া অন্য আসামি হেমায়েত বেসিক ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বর্তমানে সিটি ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি) হিসেবে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ শাখায় কর্মরত। মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেনের ছেলে হেমায়েত সাভারের সবুজবাগ এলাকার ব্লক-এ ১৬৭/১ বাড়ির বাসিন্দা। তার বর্তমান ঠিকানা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সি-ব্লকের ৭ নম্বর সড়কের ১৯৪/এ প্লটের ৪০১ ফ্ল্যাটে।

দুদক কর্মকর্তারা জানান, বেসিক ব্যাংক থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ জালিয়াতি ও আত্মসাতের অভিযোগ ২০১২ সালে আমল নেয় কমিশন। প্রায় চার বছরের অনুসন্ধান শেষে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর পল্টন, মতিঝিল ও গুলশান থানায় ৫৬টি মামলা করে দুদকের অনুসন্ধান দল। ওই মামলাগুলোতে ২ হাজার ৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। পরে আরও অন্তত ১২টি মামলা করে দুদক। এর মধ্যে ৫৬ মামলার চার্জশিট প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। এসব মামলায় ২৫ জন ব্যাংক কর্মকর্তা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণগ্রহণ করা ৫৪ প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৩০ জন ব্যক্তির নাম রয়েছে। তাছাড়া বেসিকের বিশাল ঋণ জালিয়াতিতে সম্পৃক্ত অনেক রাঘববোয়াল এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।