সম্প্রতি বনানীর অগ্নিকান্ডে ২৬ জনের প্রাণহানি ও অনেক আহত মানুষ এবং স্বজনদের আহাজারিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল রাজধানী। চকবাজারের পর পরই এই ধরনের ঘটনা শুধু উদ্বেগজনক নয় লোমহর্ষকও বটে। এত বছর পরে রাজউকের অনেকগুলো টিম সক্রিয় হয়ে উঠল। এতদিন এই টিমগুলো কী করেছে তাও ভাববার বিষয়। পৌর করপোরেশনই বা কী করছে? যাহোক সব কিছুই আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মরছে তাও সহ্য হয়ে গেছে। কিন্তু সহ্য হওয়ার বাইরেও যে কী ধরনের নতুন প্রযুক্তির অভিশাপ আমাদের ওপর এসেছে তাও রীতিমতো বিস্ময়ের সীমানা অতিক্রম করে। অগ্নিকান্ডের পর বনানীর পথটায় বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীদের ভিড় জমে যায়। এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যে ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য বাহিনীর ঢোকার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ঐ সব দর্শনার্র্থী আগুন নেভানোর কাজে বা আর্তের সেবায় না নেমে শুধু মোবাইলে ছবি তুলতে থাকে এবং তৎক্ষণাৎই ফেইসবুক নামক সভ্যতার এই অসভ্য বাহনটিতে পাঠাতে থাকে। বলতে গেলে অগ্নিকান্ডের এই নারকীয় ঘটনাটি ফেইসবুকের একটা বিনোদনে দাঁড়িয়ে যায়। ফেইসবুকর এক বড় চমক হচ্ছে সেলফি তোলা। নিজের হাস্যোজ্জ্বল ছবির সঙ্গে হতভাগ্য কিছু মানুষের ছবি তোলার মাধ্যমে মানুষ ক্রমাগত নিষ্ঠুর হয়ে পড়ছে। আবার ফোন ক্যামেরা সহজে বহনযোগ্য তাই ইচ্ছে হলেই ছবি। মানুষ কোনো কিছুকেই স্মৃতিতে রাখতে চায় না। সবটাই ক্যামেরায়। ফোন ক্যামেরায় ছবি তুলে তা দ্রুতই দিয়ে দিচ্ছে ফেইসবুকে। আবার শেয়ারের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে ফেইসবুক বন্ধুদের কাছে। যারা এই অগ্নিকান্ডে মৃত্যুবরণ করে তারাও এই বিনোদনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মানুষই প্রযুক্তির নিয়ামক। এই নিয়ামক যদি প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর তার কমনসেন্সটা প্রয়োগ না করে তাহলে তা বিপথে গিয়ে মানুষকে অমানবিক করে তোলে। আমাদের এক শিক্ষক বলতেন, ঊাবৎুঃযরহম রং পড়সসড়হংবহংব আমরা পাল্টা প্রশ্ন করলাম ঊহমরহববৎরহম বা ঝপরবহপব ্ ঞবপযহড়ষড়মু এগুলোর তত্ত্বও আছে তাও কি পড়সসড়হংবহংব? সদাহাস্য এবং পুরো কাচের চশমার আড়ালে ঢাকা চোখ দুটো চকচক করে উঠল, বললেন পড়সসড়হংবহংব রং ধ ংবহংব যিরপয রং ঁহপড়সসড়হ ঃড় বাবৎু ড়হব. স্যারের সব কথা ঠিক নয়। অবশ্যই কিছু লোকের পড়সসড়হংবহংব আছে বলেই কিছু কিছু জায়গা ঠিকঠাক চলার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এখন আর ঠিকঠাক চলছে না।
প্রযুক্তি এবং টাকা মানুষকে এমন অস্থির করে দিয়েছে যে একটা ভয়ংকর সমাজ তৈরি হয়ে গিয়েছে। দেখা যাচ্ছে প্রতিটি ঘটনার মধ্যে পরোক্ষ দুর্নীতি। দুর্নীতি মানেই অর্থ। সে শুধু যে ব্যাংকের মধ্যে পরম আনন্দে নিদ্রা যায় তাই নয় সে উৎপাত করে নানাভাবে। দায়িত্বহীন করে তোলে তার মালিককে। উদ্বুদ্ধ করে বড় ধরনের কোনো অপরাধ করতে। তাকে বিলাসী হতে, ভোগী হতে এবং তার হয়ে যা কিছু করার জন্য তাকে সাহসী করে তোলে। এর জন্য তার সহযোগী মাদক, যে মাদক তাকে নিয়ে যায় অলীক এক জগতে।
বাংলাদেশ দুর্নীতিপরায়ণদের এক অভয়ারণ্য। কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং ব্যবসায়ীদের সংসদ। আইন নির্মাণকারীরাও তাদের স্বার্থে নানা আইন প্রণয়নে সাহায্য করছে। এইসব সর্বনাশা প্রবণতার মধ্যেই জন্ম নিয়েছে ফেইসবুক। নিম্নবিত্ত মানুষও এই নেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। অসহায় নারীই ভোগের সামগ্রী। প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য একসময় এসিড নিক্ষেপ একটা ব্যবস্থা ছিল এখন তা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার। সুবর্ণচরে গত সংসদ নির্বাচনেও এমন ঘটনা হয়েছে। এবারে উপজেলা নির্বাচনেও তাই হলো। এ কোন বাংলাদেশে আমরা বসবাস করি। মুক্তিযুদ্ধের সময় যা কিছু ঘটেছে তাও হার মানছে এসব ঘটনায়। ছয় সন্তানের জননীকে এভাবে স্বামী ও সন্তানের সামনে ধর্ষণ করা যুদ্ধাপরাধীদের চাইতেও বড় অপরাধ। কিন্তু বিচার হবে কি? বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে এরা মাফ পেয়ে যায়। এ ব্যাপারে আইনবিদ শাহদীন মালিকের একটি মন্তব্য প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন বর্বরতা রোধে বর্বর আইন করলে তা যথার্থই প্রয়োগ হয় না। লাভ হয় আইনজীবীদের এবং পুলিশের। কারণ মৃত্যুদন্ড যখন একমাত্র দন্ড তখন বিচারককে যথেষ্ট সাবধানী হতে হয়। কারণ তারা মৃত্যুদন্ড লিখতে চান না। কিন্তু যদি শাস্তিটি অন্যভাবে বিন্যস্ত করা হতো তাহলে হয়তো অনেকেই শাস্তি পেত।
এসব আইনের বিষয়। কিন্তু কোর্ট-কাচারি না করেও একটা সামাজিক বিচার ব্যবস্থা কি আমরা হারিয়ে ফেলেছি? ঐ সব ধর্ষকরা যদি যুগ যুগান্তর ধরে সমাজে ঘৃণিত হয়, কেউ যদি তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা করতে না চায় তাহলে একটা বড় শাস্তি হতো। কিন্তু অর্থ, প্রভাব বা রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে যদি তারা সমাজে সম্মানিত হতে থাকে তাহলে সমস্যার কোনো সমাধান হবে না। প্রতিদিন খবরের কাগজে হেডলাইন হচ্ছে ধর্ষণ ও মৃত্যু। সর্বশেষ জানা সংবাদে রাফির অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিষ্ঠুর মৃত্যু। এ কি মৃত্যু না হত্যাকান্ড? অবশ্যই এ হত্যাকান্ড। হন্তারক মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। সুবর্ণচরের ধর্ষকদের পেছনেও যেমন রাজনৈতিক প্রশ্রয় ছিল এই অধ্যক্ষের পেছনেও। মাদ্রাসা ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। এই শিক্ষার মধ্যেও ঢুকে পড়েছে নানাবিধ পাপ। এই পাপীদের কর্মকান্ড এই প্রথম নয়।
প্রায়ই শিশু ছাত্র-ছাত্রীদের নানাভাবে ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির সংবাদ প্রকাশ্যে চলে আসছে। দু’একদিন হয়তো এই নিয়ে সংবাদ আসছে, কিন্তু কী তাদের বিচার হলো তা আমরা জানতেই পারছি না। এবারে সাংবাদিকদের অনুরোধ করব তারা যেন ধর্ষণের সংবাদের পাশাপাশি ধর্ষকদের শাস্তির সংবাদটিও দেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলটির কোনো সদস্য যদি এর সঙ্গে জড়িত থাকেন তাহলে তার শাস্তির জন্য দলই যথেষ্ট। শুধু সাংগঠনিক শাস্তি বা জেল জরিমানাই নয় তাকে জনগণের কাছে চির ঘৃণার পাত্র করে তোলা উচিত। আবার এসেছে বৈশাখ। গত এক বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কান্ড হয়েছিল তার কি দৃশ্যমান কোনো বিচার হয়েছে? মাদ্রাসা স্কুলের শিক্ষক থেকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ধর্ষকদের বিচরণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এইসব ধর্ষক ও বাসের ড্রাইভার কন্ডাকটর ধর্ষকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তাই বিচারের ক্ষেত্রে একই বিবেচনাই তাদের প্রাপ্য।
ফেইসবুকের ছবি তুলে পোস্ট করা বা নির্মম সব ধর্ষকের শিকারের অসহায় নারীটির কারও ঘটনায় অন্তরে যদি কোনো ঘৃণার সৃষ্টি না হয় তাহলে বাংলাদেশ, আমাদের গৌরবের বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ এক অমানবিক বাংলাদেশে পরিণত হবে। তাই সর্বাত্মক প্রতিরোধের এই তো সময়।