অব্যাহত থাকুক সামাজিক প্রতিরোধ

সারা গায়ে ব্যান্ডেজ, নাকে স্যালাইনের নল, দুচোখের পাতা চিরনিদ্রায় শায়িতÑ নুসরাত জাহান রাফির বেদনাক্লিষ্ট এই মুখচ্ছবি সবার মনে গেঁথে গেছে। মাদ্রাসা অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়ন মেনে না নিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করে প্রতিবাদে সরব হয়েছিল নুসরাত। মামলা তুলে নিতে অস্বীকার করায় পরীক্ষার হল থেকে ডেকে নিয়ে গায়ে কোরোসিন ঢেলে নৃশংসভাবে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে। কিন্তু শরীরের আশি ভাগই আগুনে পুড়ে গেলেও নুসরাতের কণ্ঠ স্তব্ধ করা যায়নি। ‘আমি সারা বাংলাদেশের কাছে বলব, সারা পৃথিবীর কাছে বলব এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য’ মৃত্যুশয্যায় শুয়ে নুসরাতের এই সাহসী উচ্চারণ ভুলে যায়নি দেশের মানুষ। তাই আজ শুধু এক নিপীড়িতের নাম নয়, বরং এক অসামান্য সাহসের ডাকনাম নুসরাত। বাংলা নববর্ষের দিনে দেশবাসীর কণ্ঠে নতুন সাহস হয়ে ওঠে নুসরাত। তাই বর্ষবরণের উৎসবমুখর আয়োজনেও নুসরাত হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে সরব ছিল দেশের মানুষ।

রাজধানীর রমনা বটমূলে রবিবার ছায়ানটের বর্ষবরণের ঐতিহ্যবাহী প্রভাতি অনুষ্ঠানে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। নুসরাতের পাশাপাশি তনু, মিতুসহ এমন ধর্ষণ-নিপীড়ন-হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও বিচার দাবি করা হয় অনুষ্ঠানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের অনেকে উৎসবে যোগ দিয়েছেন নুসরাত হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি নিয়ে। শোভাযাত্রা শেষে একদল শিল্পী সংস্কৃতিকর্মী নুসরাতের প্রতিকৃতি-সংবলিত ‘কন্যা সাহসিকা’ লেখা কালো টি-শার্ট গায়ে দিয়ে মৌন মিছিল নিয়ে হেঁটে যান চারুকলা থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে; টি-শার্টের পেছনে লেখা ছিল ‘কোনো ক্ষমা নেই, আমরা নুসরাত হত্যার বিচার চাই’। কেউ কেউ একাই একটা প্ল্যাকার্ড কিংবা পোস্টার নিয়ে শামিল হয়েছেন উৎসবের আনন্দে। বর্ষবরণের দিনে রাজধানীর এইসব আয়োজনের মতোই ফেনীর সোনাগাজীসহ সারা দেশেই বর্ষবরণের উৎসব সরব ছিল নুসরাত হত্যার বিচার দাবিতে। সোনাগাজীতে বর্ষবরণের আয়োজন কাটছাঁট করা হলেও সমবেত মানুষের মুখে মুখে ছিল ধর্ষকদের শাস্তি ও হত্যাকাণ্ডের বিচারের কথা।

দেশে একের পর এক ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ এবং অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষকদের বিচার হচ্ছে না। এসব নৃশংসতার ঘটনা আর বিচারহীনতায় দেশের মানুষ যে কেবল অসহায়ত্বে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়নি, সংক্ষুব্ধ মানুষ যে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে, প্রতিবাদে সরব হচ্ছে এবারের পহেলা বৈশাখের উৎসবে নুসরাতকে স্মরণ তারই বহিঃপ্রকাশ। বৈশাখের আগে থেকেই এ প্রতিবাদ চলছিল। দেশের নানা প্রান্তের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা যেমন এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে পথে নেমেছেন, তেমনি কবি-লেখক-শিল্পী-অভিনেতা-অভিনেত্রী-নাট্যকর্মী-চলচ্চিত্রকর্মীরাও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ করেছেন। এমনকি সিরাজগঞ্জের

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরাও প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথে দাঁড়িয়েছেন নুসরাত হত্যার বিচার দাবিতে। রাজধানীর এক স্কুলশিশুর প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যামে, যাতে লেখা ছিলÑ ‘স্কুলে পরিমল, মাদ্রাসায় সিরাজ, আমার বোনের নিরাপত্তা কোথায় করছে বিরাজ’। শহর-বন্দর-গ্রামে সর্বস্তরের মানুষের ধর্ষণের বিচারের দাবিতে এই সক্রিয়তা একটি নতুন বার্তা দিচ্ছে। সে বার্তা সামাজিক প্রতিরোধের ইঙ্গিতবাহী। নুসরাতের হত্যাকারীদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত এ প্রতিরোধ অব্যাহত থাকুক। অন্যান্য হত্যা, ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধেও গড়ে উঠুক শক্ত প্রতিরোধ।

নুসরাতকে যৌন নিপীড়ন এবং তাকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশদাতা সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত বেশ কয়েকজন আসামিই ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে। সোমবার নুসরাতের বাবা মা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি আবারও বলেছেন, ‘নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যাকারীদের কেউই আইনের হাত থেকে রেহাই পাবে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিবাদ করে নুসরাত এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।’ আমরা বলতে চাই, নুসরাত যেমন সাহসিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে নুসরাতের ওপর যৌন নিপীড়ন এবং এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে আমাদেরও দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। সঙ্গে এমন পদক্ষেপ দরকার, যাতে আর কোনো নারী ও শিশুকে এমন যৌন নিপীড়ন বা নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে না হয়। পাশাপাশি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে যৌন নিপীড়ন এবং ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়ে কোনো অপরাধীই যাতে পার না পায়, সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ তৎপরতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে।