খুলনার দাকোপ ও কয়রা উপজেলায় মানুষের সুপেয় পানির তীব্র সংকটে চলছে। এখানকার অগভীর নলকুপগুলো অধিকাংশই অকেজো। যে কয়েকটি সচল রয়েছে সেগুলোর পানিও লবণাক্ত ও আর্সেনিকে ভরা। এলাকার মানুষ পুকুরের পানি ফিল্টার করে পান করে। কিন্তু অধিকাংশ পুকুরেও পানি নেই।
সরেজমিনে দুই উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, পুকুরগুলোতে পানি স্বল্পতার কারণে প্রায় ফিল্টার বা পিএসএফগুলোও অকেজো হয়ে পড়েছে। জীবন বাঁচাতে মানুষ পুকুরে পানি সরাসরি পান করছেন। সে কারণে তারা পানিবাহিত রোগে ভুগছে। চায়ের দোকান, খাবার হোটেল, মিষ্টির দোকানের কেনা পানি ব্যবহার করছেন দোকানদাররা। কয়রায় খাবার পানি আনতে দেড় কিলোমিটার দূরে যেতে হচ্ছে নারীদের। এ এলাকার মরজিনা বেগম নামে এক নারী বলেন, ‘লবণ পানিতে ভরা আমাদের এ অঞ্চল। টিউবওয়েলের পানি খাওয়া যায় না। তাই দূর থেকে পানি আনতে হয়।’
আছিয়া বেগম ইসলামপুর গ্রামের সরকারি পুকুরে থেকে পানি আনার জন্য রওনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, মিষ্টি পানির উৎসগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এক কলস পানির জন্য মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয় তাদের। উপজেলার ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের অরবিন্দ ম-ল জানান, তাদের খাবার পানির জন্য ১৫ কিলোমিটার দূরে জোড়শিং ও বজবজা এলাকা থেকে পানি এনে পান করতে হয়। এ রকম সমস্যা ৪ নম্বর কয়রা, মঠবাড়ী, তেতুলতলারচর, পাথরখালী, কাটকাটাসহ অনেক এলাকার মানুষের।
বাগালী ইউনিয়নের বামিয়া সরকারি পুকুরে পানি নিতে আসা মনিরা ও রাধা রানী জানান, সংসারের কাজকর্ম ফেলে রেখে পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে প্রতিদিন এখান থেকে পানি নিয়ে বাড়িতে ফিরতে হয়। অধিক সময় অপচয় হওয়ায় অনেকে বাড়িতে কাজকর্ম ঠিকমতো করতে না পারায় সাংসারিক অশান্তি সৃষ্টি হয়। যে সব এলাকায় গভীর টিউবওয়েল রয়েছে সেগুলো চাহিদার তুলনায় কম। তাই সেখানেও লোকজনের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
দাকোপের চালনা এলাকার বাসিন্দা শংকর মণ্ডল বলেন, গরমের শুরুতে পুকুরের পানি খাবার অনুপযোগী হয়ে উঠেছে। তাই কেনা পানির ওপর আমরা নির্ভর করে বেঁচে আছি। দাকোপের ছোট জালিয়াখালি এলাকার খাদিজা আক্তার বলেন, ‘প্রায় ২ কিলোমিটার দূরি একটি কল আছে সেহেনে যাব পানি আনতি।’ দাকোপের কামারখোলা ইউনিয়ানের বাসিন্দা জয়নাল ফকির বলেন, ‘এখানে পানি পাওয়া খুব কঠিন ব্যাপার। ৪ কিলোমিটার দূরি যাইয়ে পুকুরের পানি নিয়ে আসিÑ তাই খাই।’
দাকোপ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় মোট নলকূপ রয়েছে ৫১৪টি। এরমধ্যে অতিরিক্ত লবণাক্ততাসহ বিভিন্ন কারণে অকেজো হয়ে পড়েছে ২৮২টি। ৩১০ টিপিএসএফ রয়েছে। ৮৮৮ টিএসএমটির মধ্যে অকেজো ১১৬টি। এছাড়া ১২০৮টি রেইন ওয়াটার হারভেটিং থাকলেও অতি খরার কারণে মানুষ এগুলো ব্যবহার করতে পারছে না। কয়রা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় মোট নলকূপ রয়েছে ২৭১৪টি। এরমধ্যে অতিরিক্ত লবণাক্ততাসহ বিভিন্ন কারণে অকেজো হয়ে পড়েছে ৪৩৮টি। ২২৮টি পিএসএফ রয়েছে। তার মধ্যে অকেজো রয়েছে ২০৪টি। ৭৪৫টি রেইন ওয়াটার হারভেটিং থাকলেও অতি খরার কারণে মানুষ এগুলো ব্যবহার করতে পারছে না। পানি শোধনাগার প্ল্যান্ট রয়েছে ৩টি।
কয়রা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী প্রশান্ত পাল বলেন, পানির প্রধান উৎস পুকুর-দিঘি। কয়েকবার ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে সেসব উৎসগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু এলাকার পুকুর সংস্কার করা হলেও লবণাক্ততা রয়েছে। পুকুরে পানি কমে যাওয়ায় পিএসএফ কাজ করছে না। তবে পানি সংকট নিরসনে পুকুর খনন ও পিএসএফ বসানো ছাড়া বিকল্প নেই। দাকোপ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. মিলন ফকির বলেন, পানির চাহিদা মেটাতে নতুন করে বেশি বেশি পুকুর খনন ও পিএসএফ নির্মাণ করতে হবে। এলাকায় এগুলো নির্মাণ করলে পানি সংকট নিরসন হবে।