এনবিআরের সঙ্গে রিহ্যাবের প্রাক-বাজেট সভা

১০ বছরের জন্য অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ সুবিধার প্রস্তাব

একে তো ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনার পর রেজিস্ট্রেশন করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়ছেন ক্রেতারা। কারণ, সেখানে খরচ করতে হচ্ছে কেনামূল্যের ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত। এতে অনেক ক্রেতাই বছরের পর বছর ধরে রেজিস্ট্রেশন করছেন না। এতে রাজস্বও পাচ্ছে না সরকার। এ অবস্থায় আগামী ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ফ্ল্যাট ও প্লটের রেজিস্ট্রেশন ব্যয় কমিয়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করেছেন আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব।

গতকাল সেগুনবাগিচায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ প্রস্তাব দেন সংগঠনটির নেতারা। এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন, প্রথম সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূইয়াসহ বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএলডিএ), বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশন, সিমেন্ট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ১৪ থেকে ১৬% নিবন্ধন ব্যয় আসলেই অতি উচ্চ। নিবন্ধন ব্যয় কমানোর আশ্বাস দেন তিনি। এ জন্য স্থানীয় সরকার এবং আইন মন্ত্রণালয়ে খুব শিগগিরই চিঠি দেওয়া হবে বলে জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।

রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন বলেন, ফ্ল্যাট ও জমি কেনার ক্ষেত্রে কয়েক বছর ধরে ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত নিবন্ধন ব্যয় আরোপ করা আছে, যা ক্রেতারা বহন করতে পারছেন না। নতুন অর্থবছরের বাজেটে গেইন টেক্স ২ শতাংশ, স্টাম্প ফি দেড় শতাংশ, রেজিস্ট্রেশন ফি ১ শতাংশ, স্থানীয় সরকার কর ১ শতাংশ ও মূল্য সংযোজন কর দেড় শতাংশসহ মোট ৭ শতাংশ কর ও ফি আরোপের প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, সার্কভুক্ত দেশের তুলনায় বাংলাদেশের রেজিস্ট্রেশন ব্যয় অনেক বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে এই ব্যয় ৪ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে। এছাড়া, ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কর ও ফি পরিশোধ করে দ্বিতীয়বার ফ্ল্যাট ও প্লট বিক্রির জন্য সেকেন্ডারি মার্কেট ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করেছেন তিনি। 

প্রথম ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস প্রদর্শন না করার সুযোগসহ আয়কর অধ্যাদেশ-১৯৮৪ এর ১৯বি ধারা পুনঃপ্রর্বতনের প্রস্তাব করে রিহ্যাব সভাপতি বলেন, আবাসন খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৫ থেকে ১০ বছরের জন্য গৃহায়ন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ ফ্ল্যাট, প্লট, বাণিজ্যিক ভবন ও বিপণি বিতানে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। না হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে সেকেন্ড হোম গ্রহণের সুযোগ থাকায় অনেক অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। ওইসব দেশে ফ্ল্যাট কেনার অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, অপ্রদর্শিত অর্থ দেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে ওইসব বিনিয়োগকারীরা করের আওতায় আসবেন, সরকারের রাজস্ব বাড়বে। দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে দেশে ফ্ল্যাটের ক্রেতাদের চিঠি দেওয়ায় আবাসনে বিনিয়োগে বৈরী পরিবেশ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে, যা যৌক্তিক পর্যায়ে এনে বন্ধ করা জরুরি।

আবাসন খাতের উদ্যোক্তাদের আয়কর কমানোর প্রস্তাব করে রিহ্যাব সভাপতি বলেন, দু’বছর ধরে এ খাত গভীর সংকটে রয়েছে। উদ্যোক্তারা বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে চরম অনিশ্চয়তায় আটকে গেছেন। বেশিরভাগ ডেভেলপার অতি উচ্চ সুদে ব্যাংক ঋণ নিয়েছে, যা এখন পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। আয়করের উচ্চহারের কারণে ক্রেতারাও আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ অবস্থায় রিহ্যাব আবাসিকে প্রতি বর্গমিটারে শ্রেণি-১ এ ৫০০ টাকা, শ্রেণি-২তে ৪৫০ টাকা ও শ্রেণি-৩ এ ৩০০ টাকা, অনাবাসিক ব্যবহারে শ্রেণি-১ এ এক হাজার টাকা, শ্রেণি-২তে ৮০০ টাকা ও শ্রেণি-৩ এ ৫০০ টাকা আরোপের প্রস্তাব করেছে। রাজউক ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ-সিডিএ এলাকার বাইরে জমির ক্ষেত্রে আরোপ করা ৪ শতাংশ ও ৩ শতাংশ কর প্রত্যাহার করতে বলেছে রিহ্যাব।

আয়কর অধ্যাদেশ অনুযায়ী জমির মালিকের জন্য নির্ধারিত ১৫ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ৪ শতাংশ হারে আরোপের প্রস্তাব করেছে রিহ্যাব। এছাড়া, সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) যাতে সহজ শর্তে ফ্ল্যাট কেনার জন্য ৬ থেকে ৭ শতাংশ সুদে ৩০ বছর মেয়াদি ঋণ দিতে পারে, সে জন্য বিএইচবিএফসিকে তহবিল জোগান দেওয়ার কথা বলেছে রিহ্যাব। এছাড়া, আবাসন খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের প্রস্তাব করে সংগঠনটি বলেছে, সরকার চাইলে ফ্ল্যাটের সাইজের ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও স্বল্প সুদহার নির্ধারণ করতে পারে।

সাপ্লায়ার ভ্যাট ও উৎসে কর সংগ্রহের দায়িত্ব থেকে আগামী পাঁচ বছরের জন্য ডেভেলপারদের অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করে সংগঠনটি বলেছে, ঢাকা জেলাসহ বিভিন্ন মেট্রোপলিটন এলাকা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মধ্যে ৫ বছরের জন্য ও পৌরসভার বাইরের এলাকায় নগরায়ণে ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ সুবিধা প্রয়োজন, যা অন্য শিল্প খাতে আগেই দেওয়া হয়েছে।