সিবিএর পরাক্রমে উল্টে গেল বিমানের তদন্ত প্রতিবেদন

বিদেশ থেকে আমদানি করা কাপড় খালাস না করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফেলে রাখার অবহেলার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে চূড়ান্ত করা একটি তদন্ত প্রতিবেদন সিবিএ নেতাদের চাপে পাল্টে ফেলেছে বিমান। নতুন আরেকটি তদন্ত করে বিমান কর্মীদের অব্যাহতি দিয়ে অবহেলার দায় চাপানো হয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের ওপর।

বিমান সূত্রগুলো বলছে, প্রথম প্রতিবেদনে বিমানের ১৫ জনকে দায়ী করা হলেও দ্বিতীয় তদন্ত প্রতিবেদনে কাউকে দায়ী করা হয়নি। অথচ অভিযুক্ত প্রত্যেকেই ঘটনার জন্য নিজের দায় স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন। তদন্ত কমিটির কাছে আলাদা আলাদাভাবে ঘটনার দায় স্বীকার করলেও পরে একসঙ্গে শলাপরামর্শ করে বেঁকে বসেন তারা। সিবিএর শক্তি ব্যবহার করে তারা তদন্ত প্রতিবেদন পাল্টে ফেলার দাবি জানান প্রথমে। দলবল নিয়ে সিবিএ নেতারা কর্মকর্তাদের সামনে শক্তির মহড়া দেন।  সিবিএ’র দাবির কাছে হার মেনে অভিযুক্তদের দায় থেকে অব্যাহতি দিয়ে দায়সারা গোছের প্রতিবেদন দাখিল করেছে তদন্ত কমিটি।  

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে গত ২৩ মার্চ বিমানবন্দরের সভাকক্ষে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিমানের কার্গো সংক্রান্ত আলোচনার সময় অভিযোগ করা হয় ১১৭ দিন ধরে আমদানি করা গার্মেন্টসের কাপড় বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনালে পড়ে আছে। অথচ নিয়ম হচ্ছে ২১ দিন পার হলেই অখালাসকৃত পণ্য ডিসপোজাল গুদামে পাঠাতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও কেন গার্মেন্টস পণ্য ডিসপোজাল গুদামে পাঠানো হয়নি তা তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব। বিমানের ম্যানেজার (বাণিজ্যিক আমদানি) দিবাকর দেওয়ানজী এবং  সহকারী ম্যানেজার মো. ফজলুল হককে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ৩ নভেম্বর চায়নার কুনমিং থেকে সেলিনা অ্যাপারেলস ৪২ কার্টন মালামাল আমদানি করে। ৮ নভেম্বরের মধ্যে ৩৯ কার্টন ডেলিভারি নেয় সংস্থাটি। অবশিষ্ট ৩টি কার্টন পড়ে ছিল বিমানবন্দরের ক্যানোপি এলাকার গেইট বি আউট ইয়ার্ডে। এসব কার্টনে কাপড়। যার ওজন ৮৩ কেজি। ট্রান্স গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ছিল সেলিনা অ্যাপারেলসের ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট।

যথানিয়মে সবকিছু হলে নভেম্বর মাসেই ডিসপোজাল গুদামে ইনভেন্ট্রির মাধ্যমে নিলাম করে কাপড়গুলো সরিয়ে ফেলা হতো। আমদানিকারক কাপড় গ্রহণ না করায় সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং কার্টনগুলো এলোপাতাড়ি পড়ে থাকায় বিমানবন্দরের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। যারা পালাক্রমে ১১৭ দিন ক্যানোপি এলাকার গেইট বি আউট ইয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত কমিটি। এ সময় দায়িত্ব পালন করা ১৫ জনই অপরাধ স্বীকার করে বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানান।

দায় স্বীকার করা এই ১৫ জন হলেন বিমানের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফরিদুল হক, মো. আব্দুর রহমান ও মো. হারুন অর রশিদ, ডিউটি অফিসার মো. শহীদুল ইসলাম, মো. এ ই আহমেদ ও মো. মাহবুব-উল- আলম, বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মো. শাহ আলম মিয়াজী, জুনিয়র কমার্শিয়াল অফিসার নজরুল ইসলাম, মো. জাহাঙ্গীর আলম ও মো. এজাজ উদ্দীন হাবিব বিন আহমেদ, বাণিজ্যিক সহকারী মো. আমিরুল ইসলাম, বাণিজ্যিক তত্ত্বাবধায়ক মো. শাহীন পারভেজ, মো. মঈন উদ্দিন,  মির্জা মোশাররফ হোসেন ও খালিদ বিন ওয়ালিদ।

ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো ফরিদুল হক তদন্ত কমিটিকে জানান, অনিয়মের বিষয়ে কোনো কিছুই তিনি জানেন না। অপর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুর রহমান জানান, সবাই যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করলে পণ্যগুলো ডিসপোজাল গোডাউনে পৌঁছানো যেত। ডিসপোজাল গোডাউনে না পাঠানোর জন্য তিনি বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানান। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ জানান, আরও সতর্কতার সঙ্গে কাজটি করলে অনাকাক্সিক্ষত ভুল এড়ানো যেত । তিনি ভুলের জন্য ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানান।

ডিউটি অফিসার মো. শহীদুল ইসলাম জানান, গার্মেন্টসের কাপড়গুলো তাদের তালিকায় না থাকার কারণে তিনি ডিসপোজাল গুদামে পাঠাতে পারেননি। অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে তিনি ক্ষমা চেয়েছেন।

জুনিয়র কমার্শিয়াল অফিসার নজরুল ইসলাম ও বাণিজ্যিক সহকারী মো. আমিরুল ইসলাম তদন্ত কমিটিকে জানান অন্যান্য দাপ্তরিক কাজের কারণে ভুলবশত আলোচ্য চালানটি ডিসপোজাল গুদামে স্থানান্তর করা হয়নি। তারা উভয়েই এ জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। অপর জুনিয়র কমার্শিয়াল অফিসার জাহাঙ্গীর আলম এবং বাণিজ্যিক তত্ত্বাবধায়ক মো. শাহীন পারভেজ কমিটির কাছে দাবি করেন অর্পিত দায়িত্ব তারা যথাযথভাবেই পালন করেছেন। অসতর্কতার জন্য তারা উভয়েই ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।

ডিউটি অফিসার মো. এ ই আহমেদ, জুনিয়র কমার্শিয়াল অফিসার মো. এজাজ উদ্দিন হাবিব বিন আহমেদ, বাণিজ্যিক তত্ত্বাবধায়ক মো. মঈন উদ্দিন ও মির্জা মোশারফ হোসেন ও খালিদ বিন ওয়ালিদ দাবি করেন, তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবেই পালন করেছেন। ডিসপোজাল গুদামে পাঠানোর সময় কাপড়গুলো ভুল করে ক্যানোপি এলাকায় থেকে যায়। এ অসতর্কতার জন্য তারা সবাই ক্ষমা চেয়েছেন এবং ভবিষ্যতে আরও সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেছেন। ডিসপোজাল গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিউটি অফিসার মো. মাহবুব-উল-আলম কমিটিকে জানান, ডিসপোজাল গুদামে পাঠানোর জন্য মালামাল সংগ্রহ করাই তাদের কাজ। ৮৩ কেজি কাপড় ডিসপোজাল গুদামে না পাঠিয়ে তিনি অন্যায় করেছেন এবং ক্ষমা চেয়েছেন।

প্রথম দফার তদন্ত প্রতিবেদনে গত ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে বিমানবন্দরের ক্যানোপি এলাকায় যারা কর্মরত ছিলেন তাদের সবাইকে দায়ী করা হয়। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য সুপারিশ করে তদন্ত কমিটি।

সংশ্লিষ্টদের সাক্ষ্য নেওয়ার পর তদন্ত কমিটি গত ২৮ মার্চ প্রতিবেদন বিমানের মহাব্যবস্থাপক (কার্গো) আরিফ উল্লাহর কাছে জমা দেয়। এরপরই বিষয়টি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বিমানের কার্গো ইউনিটের সিবিএ সভাপতি মারুফ হাসান মেহেদীসহ উল্লিখিত ১৫ জন আরিফ উল্লাহর কাছে যান। তারা তদন্ত প্রতিবেদন থেকে সংশ্লিষ্টদের নাম বাদ দেওয়ার দাবি জানান। একপর্যায়ে আরিফ উল্লাহ বিষয়টি নিয়ে টেলিফোনে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসাদ্দিক আহম্মদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। শেষ পর্যন্ত ১৫ জনকে সরাসরি দায়ী না করে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার শর্তে তারা মহাব্যবস্থাপকের অফিস ছাড়েন। একই দিন তদন্ত কর্মকর্তাদের ডেকে অভিযুক্তদের নাম বাদ দিয়ে নতুন করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ যায় তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তারা নতুন করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। নতুন প্রতিবেদনে কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। তবে ঘটনা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে তাদের দ্রুত নিলামের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির সুপারিশ করা হয়।   

বিমান সিবিএ কার্গো বিভাগীয় সভাপতি মারুফ মেহেদী হাসান গত সোমবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার নেতৃত্বে চাপ প্রয়োগ করে তদন্ত প্রতিবেদন পাল্টে ফেলার যে অভিযোগ করা হয়েছে তা মিথ্যা। কার্গো এলাকায় মালামাল পড়ে থাকার ঘটনা আমি শুনেছি। এ কাজে অবহেলার জন্য তদন্ত কমিটি গঠনের কথাও আমি জানি। কিন্তু কর্তৃপক্ষকে কোনো চাপ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বিমানবন্দরে সিবিএ কাজ করে কল্যাণের জন্য বা ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য। সিবিএ হচ্ছে ন্যায়বিচারের প্রতীক। একটি চক্র সব কিছুতে সিবিএকে জড়ানোর চেষ্টা করে। যা মোটেই কাম্য নয়।’

তদন্ত কর্মকর্তা দিবাকর দেওয়ানজী (ব্যবস্থাপক- বাণিজ্যিক আমদানি) বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন। তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। অপর তদন্ত কর্মকর্তা মো. ফজলুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তদন্ত করেছি। তদন্ত প্রতিবেদন জমাও দিয়েছি। কর্তৃপক্ষ সেই প্রতিবেদন এমডি বা মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। এর বাইরে আমি কোনো বিষয়ে কথা বলতে পারব না।’

বিমানের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সংশ্লিষ্টদের অবহেলার জন্য কার্গো এলাকায় মালামাল পড়ে থাকে। এসব অনিয়মের নেপথ্যে আরও কিছু বিষয় কাজ করছে। কার্গো এলোমেলো করে রাখলে তা চুরি করতে সুবিধা হয়। চুরি হয়ে গেলে বিমানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়। এ ক্ষতিপূরণের টাকা ভাগাভাগি করে নেয় বিমান কর্মী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একটি অংশ। তিনি আরও জানান, বিমানের কার্গো টার্মিনালের অবস্থা খুবই বিশৃঙ্খল ছিল। হাজার হাজার কার্গো কার্টন যত্রতত্র পড়ে ছিল। গুদাম পরিপূর্ণ হয়ে সেসব মালামাল গুদামের বারান্দা এমনকি খোলা আকাশের নিচেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। এয়ারওয়ে বিল থাকলেও তা দিয়ে কোনো ভাবেই সংশ্লিষ্ট পণ্য খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল। সেই অবস্থা থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার তৎকালীন মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদকে দায়িত্ব দেন। আবুল কালাম আজাদ দফায় দফায় বৈঠক করে কার্গো এলাকায় বিশৃঙ্খলা কমিয়ে আনেন। কার্গোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-সচিবদের নিয়েও বৈঠক করেন।  এক পর্যায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারীর দায়িত্ব নেন। নতুন দায়িত্বে থেকেও তিনি বিমানবন্দরের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। ২০১৭ সাল থেকে বিমানবন্দরের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজে হাত দেন নজিবুর রহমান। তিনিও দফায় দফায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ মার্চ বিমানবন্দরের সম্মেলনকক্ষে বৈঠক করেন নজিবুর রহমান। ওই বৈঠকে কার্গো এলাকায় মালামাল পড়ে থাকার ঘটনা তদন্ত করা ছাড়াও আরও কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এসবের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ৮ মিনিটের মধ্যে যাত্রীদের লাগেজ বেল্টে দেওয়া শুরু হবে। ৬০ মিনিটের মধ্যে বেল্টে মালামাল না দিতে পারলে তা হোম ডেলিভারির মাধ্যমে যাত্রীর ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া হবে।  ইমিগ্রেশনে ইলেকট্রিক গেইট স্থাপন, বিজনেস ক্লাস ও সিআইপিদের জন্য আলাদা ইমিগ্রেশন কাউন্টার স্থাপনের বিষয়গুলোও আলোচনায় স্থান পায়। একই বৈঠকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডেলিং চার্জের তুলনামূলক বিবরণী তৈরি করার জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্ব কমিটি গঠন করা হয়েছে।