১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনার পর দুই দশকের বেশি সময় পার হলেও এ ঘটনায় করা মামলার বিচারে সাজা ভোগ করতে হয়নি কাউকে। ওই ঘটনায় করা ১৫ মামলার একটিতে দুই আসামি দণ্ডিত হলেও ধরা পড়েননি, আরেকটি মামলা আসামির মৃত্যুজনিত কারণে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। বাকি ১৩ মামলার মধ্যে তিনটি স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে খারিজ হয়েছে; বিচারকাজ স্থগিত আছে পাঁচটির এবং ছয়টি মামলার আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়েছেন। স্থগিত হওয়া মামলাগুলোর বিচারকাজ সচলের জন্য এবং মামলা খারিজ ও খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
শেয়ার কেলেঙ্কারি ও আইন ভঙ্গের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতির প্রতিবেদন চেয়ে গত ১৮ অক্টোবর বিএসইসিকে চিঠি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। মামলাগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে গত ৯ এপ্রিল ১৯ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
এ বছর ২৪ জানুয়ারি থেকে পুঁজিবাজারে দরপতন চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা রাস্তায় নামতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর আগেই গত ২৭ মার্চ শেয়ারবাজারের দুই কেলেঙ্কারি ও সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা নিতে বিএসইসি আইনজীবীদের চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছে।
১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির ১৪ বছর পর ২০১০ সালে আরেক কেলেঙ্কারির ঘটনায় নিঃস্ব হন অনেক বিনিয়োগকারী। ওই ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলার বিচারকাজই স্থগিত রয়েছে। এ দুটি ঘটনা ছাড়াও ২০০২ সাল থেকে বিভিন্ন সময় সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গের দায়ে করা ১৫ মামলার বিচার চলছে ধীরগতিতে। এসব মামলার তিনটিতে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল আসামিদের সাজা দেওয়ার পর তারা আপিল করেছেন, বাকি পাঁচটিতে আসামিদের বেকসুর খালাস দিয়েছে আদালত। এর মধ্যে উপযুক্ত প্রমাণ না থাকায় দুই মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেনি বিএসইসি, বাকি তিনটিতে আপিল হয়েছে।
শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনায় দায়ের করা ১৭ মামলার মধ্যে ১০টিতে বিএসইসির আইনজীবী প্রবীর নিয়োগী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা ঠিক যে, শেয়ার কেলেঙ্কারির মামলাগুলো ধীরগতিতে এগোচ্ছে। দুই যুগ হলেও মামলাগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হচ্ছে না। অনেক মামলার কার্যক্রম বিভিন্ন পর্যায়ে স্থগিত রয়েছে, কোনো কোনো মামলা খারিজ করা হয়েছে। স্থগিত মামলার বিচারকাজ শুরু করা ও খারিজ হওয়া মামলা সচল করার জন্য কাজ চলছে।’
১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনায় পরের বছর মামলা করে বিএসইসি। এর মধ্যে ফার্স্ট ক্যাপিটাল সিকিউরিটিজ, এসইএস কোম্পানি, মসিউর রহমান, আমাম সি ফুডস ইন্ডাস্ট্রিজ, এপেক্স ফুডস, ইমতিয়াজ হোসেন অ্যান্ড কোম্পানি ও ২০১০ সালের কেলেঙ্কারিতে সৈয়দ সিরাজউদ্দৌলা গং ও আবু সাদাত মো. সায়েম গংয়ের বিরুদ্ধে দায়ে করা মামলার বিচারকাজ স্থগিত রয়েছে।
’৯৬ সালের ঘটনায় চিক টেক্স লিমিটেডের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার আসামি ইঞ্জিনিয়ার মো. মাকসুদুর রসুল ও ইফতেখার মোহাম্মদকে ২০১৫ সালের ৩১ আগস্ট চার বছরের কারাদণ্ড ও ৩০ লাখ টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয় স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল, কিন্তু আসামিরা পলাতক রয়েছেন।
সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গের অভিযোগে দায়ের করা ১৫ মামলার মধ্যে অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, তৃপ্তি ইন্ডাস্ট্রিজ, এ আর স্পিনিং মিলস, সাত্তারুজ্জামান শামীম, মো. কুতুবউদ্দিনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন। এর মধ্যে সাত্তারুজ্জামান শামীম ও কুতুবউদ্দিনের বিরুদ্ধে কমিশনের কাছে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ না থাকায় আপিল না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি।
স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল মার্ক বিডি লিমিটেডের মুলকুতুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় আসামিদের প্রত্যেককে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। রায়ের বিরুদ্ধে গত বছর আসামি সালমা আক্তার ফৌজদারি আপিল করেছেন। বাংলাদেশ ওয়েলডিং ইলেকট্রোডস লিমিটেডের বিরুদ্ধে করা মামলার রায়ে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল আসামিদের তিন বছর করে কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা করে জরিমানা করে। পরে আসামিরা আপিল করলে হাইকোর্ট ট্রাইব্যুনালের রায় বাতিল করে। পরে ক্রিমিনাল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল করেছে বিএসইসি। মাহবুব সারোয়ারের বিরুদ্ধে করা দুটি মামলায় স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেগুলোর বিরুদ্ধে আসামীপক্ষ আপিল করেছে। সিকিউরিটিজ প্রমোশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় আসামিকে দুই বছরের কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে স্পেশাল ট্রাইবুন্যাল। তবে আসামি পলাতক রয়েছে।