মন্ত্রণালয়কে দুদকের প্রতিবেদন

তিতাসে দুর্নীতি ২২ খাতে

‘তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে’ ২২ খাতে সম্ভাব্য দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২ দফা সুপারিশও করেছে দুদক।

গতকাল বুধবার দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর কাছে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন।

দুর্নীতির উৎসগুলো হলো অবৈধ সংযোগ, নতুন সংযোগে অনীহা এবং অবৈধ সংযোগ বৈধ না করা, অবৈধ লাইন পুনঃসংযোগ, অবৈধ সংযোগ বন্ধে আইনগত পদক্ষেপ না নেওয়া, অদৃশ্য হস্তক্ষেপে অবৈধ সংযোগ, গ্যাস সংযোগে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ না করা, বাণিজ্যিক শ্রেণির গ্রাহককে শিল্প শ্রেণির গ্রাহক হিসেবে সংযোগ প্রদান, মিটার টেম্পারিং, অনুমোদনের অতিরিক্ত বয়লার ও জেনারেটরে গ্যাস সংযোগ, মিটার বাইপাস করে সংযোগ প্রদান-সংক্রান্ত দুর্নীতি, এস্টিমেশন অপেক্ষা গ্যাস কম সরবরাহ করেও সিস্টেমলস দেখানো,  ইচ্ছাকৃতভাবে ইভিসি (ইলেকট্রনিক ভলিউম কারেক্টর) না বসানো ইত্যাদি। দুদকের দুর্নীতি-সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিম কর্তৃক প্রণীত অনুসন্ধানী এবং পর্যবেক্ষণমূলক প্রতিবেদনে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

প্রতিবেদন হস্তান্তরের সময় দুদক কমিশনার ড. মো. মোজাম্মেল হক খান বলেন, দুর্নীতির জনশ্রুতি রয়েছে এমন ২৫টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান আইন, বিধি, পরিচালনা পদ্ধতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ/অপচয়ের দিকগুলো পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে এসব প্রতিষ্ঠানের জনসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সফলতা ও সীমাবদ্ধতা, আইনি জটিলতা, সেবা গ্রহীতাদের হয়রানি ও দুর্নীতির কারণগুলো চিহ্নিত করে তা বন্ধে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২০১৭ সাল থেকে ২৫টি প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করে দুদক। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি টিমের প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, এসব টিম অনুসন্ধান চালিয়ে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে। তিতাস গ্যাস-সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিম তাদের অনুসন্ধানকালে তিতাস গ্যাস কোম্পানির অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তা এবং এ বিষয়ে যারা সম্যক ধারণা রাখেন তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করে।

প্রাতিষ্ঠানিক টিম তাদের অনুসন্ধানে পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্যসহ ভুক্তভোগী সেবা গ্রহীতাদের বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষা ও অডিট প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করে। সার্বিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক টিম তিতাস গ্যাস কোম্পানির দুর্নীতির উৎস ও ক্ষেত্র চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে প্রণীত সুপারিশমালা প্রতিবেদন আকারে কমিশনে দাখিল করে। তিনি বলেন, কমিশনের এই প্রতিবেদন অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হলে দুর্নীতি প্রতিরোধ সহজ হবে। এভাবে দুর্নীতি সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধ করা গেলে, মামলা-মোকদ্দমা করার প্রয়োজন পড়বে না। তিনি আরও বলেন, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য-সহিষ্ণুতার যে ঘোষণা দিয়েছে, কমিশন সে ঘোষণা বাস্তবায়নে, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বহুমাত্রিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমন্বিত উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এসব প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে। এ সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দুদকের এই কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, দুদকের এই প্রতিবেদন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে শূন্য-সহিষ্ণুতা নীতি ঘোষণা করেছেন, এই মন্ত্রণালয়ে তা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হবে।

এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে কমিশন ১২ দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ মিটার টেম্পারিং রোধে গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের অপচয় বন্ধ করতে ডিস্ট্রিবিউশন এবং গ্রাহক উভয় ক্ষেত্রে প্রিপেইড মিটার চালু করা, মোবাইল কোর্টের আদলে আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা।

প্রতিবেদন প্রণয়নে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের আইন, বিধি, পরিচালনা পদ্ধতি, সরকারি অর্থ অপচয়ের দিকসমূহ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে এই প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি বিবেচনা করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

দুদকের প্রতিবেদনে বলে হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, সরকারি সেবা প্রদান প্রক্রিয়ায় পদ্ধতিগত সংস্কারের মাধ্যমে ঘুষ, দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রতা এবং জনহয়রানি লাঘব করার পথকে সুগম করা যেতে পারে। দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি সেবা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা, জনহয়রানি প্রশমনে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালে কমিশন কর্তৃক তিনটি প্রাতিষ্ঠানিক টিমের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। ২০১৯ সালে স্বাস্থ্য খাত, বাংলাদেশ বিমান, বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং হিসাব রক্ষণ অফিসগুলোর পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।