মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই কবেই বলে দিয়েছেন, ৪২-এর ৪২টাই চাই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে অঙ্কটা যে এবার এত সহজ হবে না, সে কথা দিদিকে পদে পদে বুঝিয়ে দিচ্ছে বিজেপি। পাল্টা দাবি তুলে ভোটের বাজার গরম করে রেখেছে গেরুয়া শিবির। কেউ বলছেন ২০, কেউ বলছেন ২৩, কেউ বা বুক ঠুকে বলে দিচ্ছেন বাংলার ৩০ আসনে জয়ের পতাকা ওড়াবে নরেন্দ্র মোদির দল।
৫৪৩ আসন ঘিরে লোকসভার চলতি ভোটযুদ্ধ যদি মোদির ক্ষমতায় ফেরার লড়াই হয়, তাহলে এই বাংলার ৪২ আসনের লড়াইটা হলো মমতার রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার। ২০১৪-এর লোকসভা নির্বাচনে অমন মোদি-ঝড় সামলেও পশ্চিমবঙ্গের শাসক তৃণমূল ঘরে তুলেছিল ৩৪টি আসন। সেবার আসমুদ্র হিমাচল জয় করেও এই বাংলায় বিজেপির জুটেছিল সাকল্যে দুইÑ দার্জিলিং ও আসানসোল। এমনকি ২০১৬-এর রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনেও নারদ ও সারদা কেলেঙ্কারির ধাক্কা সামলেও বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে ফিরেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল।
বস্তুত প্রায় আট বছর ধরে ছোট-বড় মাঝারি সব নির্বাচনে তৃণমূলেরই একচ্ছত্র আধিপত্য এই বঙ্গদেশে। তবে বলা বাহুল্য, এই ভাবমূর্তিতে তাল কেটে যায় গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে। লাগামছাড়া
সন্ত্রাস আর বেনজির জোরজবরদস্তির সেই নির্বাচনে তৃণমূলই অধিকাংশ পঞ্চায়েত দখল করেছে ঠিকই কিন্তু সেই ডামাডোলের ভোটেও বিজেপির উত্থানের ছবিটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। কংগ্রেস এবং এ রাজ্যের ৩৪ বছরের শাসক বামদের টপকে বিজেপিই যে প্রধান বিরোধী দলে জায়গাটা দখল করে নিয়েছে, সে কথা মানছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা, এমনকি জনান্তিকে তৃণমূলের কর্তারাও।
দলের গেরুয়া পালে ঝোড়ো হাওয়ার আভাস পেয়ে উৎসাহিত বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব। বস্তুত, কেন্দ্রের শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্ব, অন্য রূপকে বললে, মোদি-অমিত শাহ ব্রিগেড পাখির চোখ করেছে এই বাংলাকেই। লক্ষ্যটা তাদের বাংলার মসনদ। ২০১৯-এ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে আপাতচক্ষে যে গেরুয়া বাতাসের দাপাদাপি টের পাওয়া যাচ্ছে, তার আসল রূপটা কী গভীরতাই বা কতখানি তা চলতি নির্বাচনের কষ্টিপাথরে যাচাই করে নিতে চাইছে বিজেপি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিদায়ী সাংসদ সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়ার একটি মন্তব্যে আরও স্পষ্ট হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আগাম গেমপ্ল্যান। বর্ধমানে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে তার মন্তব্য, ‘৪২ আসনে জেতার দিবাস্বপ্ন দেখছেন দিদি। ৪২ আসনের মধ্যে বিজেপিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতিয়ে দিন। ছয় মাসের মধ্যে মোদি সরকারকে দিয়ে বিধানসভা নির্বাচন করিয়ে দেব।’ এমন প্রত্যক্ষ হুমকিতে দৃশ্যতই নড়েচড়ে বসেছে বঙ্গের রাজনৈতিক মহল।
বিজেপির স্বপ্নের উৎসটা আরও পরিষ্কার হয়েছে বুধবার বারাসাতে গিয়ে ব্যারাকপুরে বিজেপি প্রার্থী সদ্য তৃণমূলত্যাগী অর্জুন সিংয়ের বক্তব্যে। তার দাবি, আসন্ন নির্বাচনে রাজ্যের অন্তত ১৩০টি বিধানসভা ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে বিজেপি। এবং এই নির্বাচনের পরই অন্তত ১০০ জন তৃণমূল বিধায়ক যোগ দেবেন বিজেপিতে। এ কোনো বিক্ষিপ্ত তাৎক্ষণিক মন্তব্য নয়। এমন দাবি তিনি এর আগেও করেছেন একাধিকবার। ফলে এ মন্তব্যকে গুরুত্ব দিতেই হচ্ছে।
অর্জুন নিজেও ব্যারাকপুরের তৃণমূল-টিকিট দীনেশ ত্রিবেদির হাতে চলে যাওয়ার পর তৃণমূল ছেড়ে যোগ দেন বিজেপিতে। ওই অঞ্চলের দোর্দ-প্রতাপ এই নেতার দলবদল এবং বিজেপির টিকিটে দাঁড়িয়ে যাওয়া কী প্রভাব ফেলবে তা বোঝা যাবে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর। তবে অর্জুনই তো একা নন। তৃণমূলের ঘর ভাঙার শুরু মমতার একদা বিশ^স্ত সেনাপতি মুকুল রায়ের গেরুয়া শিবিরে নাম লেখানো থেকে।
কেউ কেউ বলেন, ভারতের বর্তমান রাজনীতির রাশ এখন আয়ারাম-গয়ারামদের হাতেই। আপাতত দলছুটদের নিয়ে দল ভারী করে ভোটের আগে সবচেয়ে বেশি লাভ উঠিয়েছে বিজেপিই। ৪২ কেন্দ্রের মধ্যে মোট ৯ জন অন্য দল ছেড়ে আসাদের প্রার্থী করেছে তারা। এই তালিকায় অর্জুন ছাড়াও আছেন তৃণমূল ছেড়ে আসা অনুপম হাজরা, সৌমিত খাঁ, নিশীথ অধিকারী, হুমায়ুন কবীরের মতো সাংসদ-বিধায়করা। আছেন দুইবারের সিপিএম বিধায়ক মাফুজা খাতুন ও খগেন মুর্মুর মতো নেতারা। ভোটের পর দিল্লিতে ফের মোদি ক্ষমতায় এলে তৃণমূলে সর্বনাশা ধস নামিয়ে বঙ্গ বিজয়ের স্বপ্নে বুক বেঁধে আছে বিজেপি। স্বস্তিত্বে নেই মমতার শিবিরও। দৃষ্টান্ত, মুকুল রায়কে রাতবিরেতে বাড়িতে ডেকে ‘লুচি-মাংস খাইয়ে’ এরই মধ্যে দলের বিষনজরে রয়েছেন বিধাননগরের মেয়র সব্যসাচী দত্তের মতো নেতা। সদ্য প্রাক্তন কলকাতার মেয়র তথা মন্ত্রী শোভন চট্টোপাধ্যায়ও এখন দলের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সুতরাং অশনিসংকেতটা স্পষ্ট।
তবে দলছুটদের নিয়ে দল ভরানোর পথ দেখিয়েছে তৃণমূলই। এই নির্বাচনেও তৃণমূলের পাঁচজন প্রার্থী অন্য দল ভেঙে আসা। অন্যের ঘর ভাঙার সংস্কৃতি এখন ব্যুমেরাং হয়ে ফিরছে তাদের দিকেই।