যৌন নিপীড়নের পর পুড়িয়ে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যেও থেমে নেই ধর্ষণ-নিপীড়ন-হয়রানি। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে শিশু-ছাত্রী, গৃহবধূ। গতকাল শুক্রবারও বাগেরহাটের রামপালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া এক মাদ্রাসাছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
রাজবাড়ীতে প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন করেছে এক বখাটে। রংপুরে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মুন্সীগঞ্জে অপহরণের পর স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে বখাটেরা। পরে অপমান সইতে না পেরে ওই ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে।
টাঙ্গাইলের পাকিস্তানি এক কিশোরী ছাত্রীকে (১৭) অপহরণ করে ধর্ষণের ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে ধর্ষক আল আমিন পলাতক। নির্যাতনের শিকার ওই কিশোরী ভ্রমণ ভিসা নিয়ে পাকিস্তান থেকে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে টাঙ্গাইলে আসে। এরপর ধর্ষণের শিকার হয়। সে পাকিস্তানের নিউ করাচির পুপার হাইওয়েজ রোডের বাসিন্দা ও নবম শ্রেণির ছাত্রী। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
বাগেরহাটে মাদ্রাসাছাত্রী : বাগেরহাটের রামপালে ১১ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। গতকাল দুপুরে ধর্ষণের অভিযোগ পেয়ে পুলিশ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে ফেরদৌস শেখ (১৮) নামে এক তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে। শিশুটি রামপাল শরাফপুর ফাজিল মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির আবাসিক ছাত্রী। গতকাল দুপুরে ওই শিশুকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আজ শনিবার বাগেরহাট সদর হাসপাতালে তার ডাক্তারি পরীক্ষা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রামপাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লুৎফর রহমান বলেন, শিশুটির বাড়ি নওগাঁয়। সে তার নানা বাড়ি বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় থাকে। ছয় মাস আগে শিশুটিকে তার মামারা পাশর্^বর্তী শরাফপুর ফাজিল মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করে। সেই থেকে মেয়েটি মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে থেকে পড়ালেখা করছিল। এখানে ভর্তি হওয়ার পর মাদ্রাসার সামনের মুদি দোকানি ফেরদৌসের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে গত ১১ এপ্রিল বিকেলে মুদি দোকানি ফেরদৌস কৌশলে শিশুটিকে ধর্ষণ করে। বৃহস্পতিবার তার মামাদের বিষয়টি জানালে তারা পুলিশের কাছে অভিযোগ দেন। অভিযোগ পেয়ে মুদি দোকানি ফেরদৌসকে গ্রেপ্তার করে। ফেরদৌস শেখের বাড়ি রামপালের শরাফপুর গ্রামে।
রাজবাড়ীতে অষ্টম শ্রেণির স্কুলছাত্রী : প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে (১৩) চপেটাঘাত ও যৌন নিপীড়নের মামলায় এক যুবককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গত শুক্রবার ফজলে রাব্বি শাকিল (২৩) নামের ওই যুবককে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
রাজবাড়ী থানার ওসি স্বপন কুমার জানান, চপেটাঘাত ও যৌনপীড়নের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার সকালে ওই ছাত্রীর বাবা তিনজনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন। তারা হলো শ্রীপুর গ্রামের অটোরিকশাচালক রহমত মোল্লার ছেলে মশিউর রহমান ওরফে মিথুন (২২) ও তার বন্ধু দীপংকর (২০) এবং সজ্জনকান্দা গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে শাকিল।
মামলায় ওই ছাত্রীর বাবা জানান, প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় স্কুলে যাওয়া-আসার পথে আসামিরা মেয়েটিকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। গত বুধবার বিকেলে প্রাইভেট পড়ে শহর থেকে বাড়ি ফেরার পথে এলজিইডি ভবনের সামনে পথরোধ করে তাকে আবারও প্রেমের প্রস্তাব দেয় তারা। কিন্তু রাজি না হওয়ায় আসামিরা ওড়না ধরে টানাটানি ও মেয়েটিকে চড়থাপ্পড় মারে। এ সময় চিৎকার করলে মিথুন তাকে যৌনপীড়নের পর ভয়ভীতি দেখিয়ে চলে যায়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রাজবাড়ী থানার এসআই এনছের আলী বলেন, মিথুনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
রংপুরে পঞ্চম শ্রেণির স্কুলছাত্রী : রংপুর নগরীর পা-ারদিঘি ধাপ কামারপাড়ায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় গত বৃহস্প্রতিবার ধর্ষক মিন্টু রায়সহ (৩২) চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ১৫ এপ্রিল ঘটনার পর সালিশ বৈঠকের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। পরে বুধবার রাতে শিশুটির মা বাদী হয়ে পাঁচজনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন।
মামলার আসামিরা হলেন ধর্ষক মিন্টু, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা হারাধন রায়, ধর্ষকের শ্যালক সম্ভু রায়, টেংকু রায় ও প্রতিবেশী মেহেদুল ইসলাম। এর মধ্যে যুবলীগ নেতা হারাধন রায় ছাড়া সবাই গ্রেপ্তার হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, মামলা তুলে নিতে কাউন্সিলর হারাধন, ধর্ষক মিন্টুর শ্যালক সম্ভু ও টেংকু রায় হুমকি দিচ্ছে।
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ১৫ এপ্রিল বাড়িতে কেউ না থাকায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ওই শিশুকে ধর্ষণ করে মিন্টু রায়। শিশুটির চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এলে মিন্টু রায় পালিয়ে যায়। ঘটনার সময় শিশুটির দিনমজুর বাবা মাঠে ছিলেন। মা অন্যের বাড়িতে কাজে গিয়েছিলেন।
পুলিশ জানিয়েছে, রংপুর সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হারাধন রায় হারা মীমাংসার দায়িত্ব নিয়ে কালক্ষেপণ করেন। ধর্ষণের ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে ধর্ষককে সহযোগিতার অভিযোগে ধর্ষকের শ্যালক সম্ভু রায়, টেংকু রায় ও মেহেদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। মেয়েটিকে উদ্ধার করে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখা হয়েছে।
এ ব্যাপারে রংপুর সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর যুবলীগ নেতা হারাধন রায় বলেন, ‘ধর্ষণের ঘটনাটি ১৫ এপ্রিল ঘটেছে। দুই পক্ষই ১৬ এপ্রিল আমার কাছে এসেছিল। তখন আমি ছেলেপক্ষকে বলেছিলাম ছেলেকে হাজির করান, তারপর মীমাংসা। কিন্তু তারা আমাকে মামলাতে জড়িয়েছে। এটা ঠিক নয়।’
মুন্সীগঞ্জে অষ্টম শ্রেণির স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা : মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে অপহরণের পর ধর্ষণের অপমান সইতে না পেরে সেতু ম-ল (১৪) নামে এক স্কুলছাত্রী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ সোহেল মিয়া (২৪) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাকে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠিয়েছে পুলিশ। পরে তাকে আদালত জেলহাজতে পাঠায়।
বুধবার দিবাগত রাতে সিরাজদীখান থানায় স্কুলছাত্রীর মা রেখা ম-ল বাদী হয়ে সোহেল মিয়ার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও দুজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছে। নিহত সেতু ম-ল সিরাজদীখান উপজেলার গোয়ালখালী গ্রামের কুয়েত প্রবাসী গোপাল ম-লের মেয়ে। সে নিজ গ্রামের পাশর্^বর্তী ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার দৌলতপুর কবি নজরুল উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী।
পাকিস্তানি কিশোরী ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার ১ : টাঙ্গাইলের গোপালপুরে পাকিস্তানি এক কিশোরী ছাত্রীকে (১৭) অপহরণের পর ধর্ষণ করার অভিযোগে উঠেছে। এ ঘটনায় ধর্ষক আল আমিনের মাকে (৪৭) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর আগে বুধবার রাতে ধর্ষিতার মা বাদী হয়ে তিনজনকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে থানায় মামলা দায়ের করেন। পরে বৃহস্পতিবার ভোরে জামালপুরের সরিষাবাড়ী থেকে অপহরণের স্বীকার ওই কিশোরীকে উদ্ধার করে। বিকেলে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন হয়।
জানা যায়, নির্যাতনের শিকার ওই কিশোরী ভ্রমণ ভিসা নিয়ে মায়ের সঙ্গে বাংলাদেশে বেড়াতে আসে। সে পাকিস্তানের নিউ করাচির পুপার হাইওয়েজ রোডের বাসিন্দা এবং সেখানকার একটি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী।
গোপালপুর থানার ওসি হাসান আল মামুন বলেন, উপজেলার উত্তর গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা হুমায়ুন কবীর আনুমানিক ২০ বছর আগে পাকিস্তানের নিউ করাচিতে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানে পাকিস্তানি নাগরিক নীলুফার বেগমকে বিয়ে করে গার্মেন্টস ব্যবসা শুরু করেছিলেন হুমায়ুন। পাঁচ মাস আগে গত বছরের ২২ নভেম্বর হুমায়ুনের স্ত্রী ছয় মাসের ভিসায় মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে স্বামীর বাড়ি বেড়াতে আসেন।
গত মঙ্গলবার রাতে একদল সন্ত্রাসীর সহযোগিতায় আল আমিন তার চাচা আব্দুল ওয়াদুদের বাড়ি থেকে মেয়েটিকে কৌশলে অপহরণ করে। পরে আটকে রেখে একাধিকবার ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।