রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও কফি আনান প্রতিবেদন

বিগত ১৫ নভেম্বর ২০১৯, দু’হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে তাদের দুয়ারে গাড়ি প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু ‘ন যাইয়ুম’, ‘ন যাইয়ুম’ সেøাগানে মুখরিত হয়ে যায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প, তারা কেউ মিছিল করে, কেউ পালিয়ে থাকে। বলা হলো, তারা না গেলে সাহায্য বন্ধ হয়ে যাবে, না খেয়ে মরতে হবে। কিš‘ তাদের দাবি ছিল, নাগরিকত্ব না দিলে তারা ফিরে যাবে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ ভেস্তে গেল। এ রকম হলে বাংলাদেশে অবস্থানরত ১০/১২ লক্ষ রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ কী হবে? এরা তো বাংলাদেশের জন্য আপদ এবং বোঝা। মিয়ানমারের মানুষ তারা, শরণার্থী হয়ে এসেছে। তবে, রোহিঙ্গাদের জোর করে ঠেলে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। ওদের কথা শুনতে হবে, ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে ওদের অনীহার বিষয়গুলোর সুষ্ঠু সমাধান দিতে হবে।  

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমারের (বার্মা) রাখাইন (আরাকান) রাজ্যের অবস্থান। এই রাজ্যের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ১৯৪০-এর দশক থেকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে দফায় দফায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সম্প্রতি সেখানে ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’ নামের একটি বিদ্রোহী সংগঠন গড়ে ওঠে, যারা রোহিঙ্গা রক্ষার নামে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছে। বিগত ২৫ আগস্ট ২০১৭ তাদের এক হামলার অজুহাতে রোহিঙ্গা গ্রাম-জনপদগুলোতে মারাত্মক অভিযান চালানো হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আরাকান থেকে রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। বাংলাদেশ সরকার প্রথমে মিয়ানমার সরকারকে সামরিক সাহায্য দেওয়ার পক্ষে মত দেয়। রোহিঙ্গা সমস্যা মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গাদের সাহায্যে এগিয়ে যান। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা ১৬ কোটি মানুষকে খাওয়াতে পারলে ৭ লক্ষ রোহিঙ্গাকেও খাওয়াতে পারব’। এ পরিস্থিতিতে আরাকানের রোহিঙ্গারা তাদের আগুনে পোড়া গ্রাম আর সহায়-সম্পত্তি ও আবাদি জমি ফেলে ব্যাপক হারে বাংলাদেশে আসতে থাকে।

বিগত ২৫ আগস্ট ২০১৭ সন্ত্রাস ও দাঙ্গার পর আরাকান থেকে রোহিঙ্গারা চলে আসতে থাকলে আমরা বলেছিলাম, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের আদিবাসী, রাজনৈতিক কারণে তাদের এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তাই রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান করতে হবে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার সামরিকভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে চায়। আমরা বাংলাদেশ সরকারের ‘শান্তি বাহিনী’র সঙ্গে অভিজ্ঞতার আলোকে মিয়ানমার সরকারকে সমস্যাটির রাজনৈতিক সমাধানে সাহায্য করতে বলি, সামরিকভাবে নয়। আমরা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন করার প্রস্তাব করি। কিন্তু চীন, রাশিয়া ও ভারত মিয়ানমার সরকারের পক্ষে দাঁড়ালে বাংলাদেশ সরকার নিশ্চুপ থাকে। রোহিঙ্গা সমস্যা মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার অবস্থান থেকে সরে এসে ১২ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গাদের সাহায্যে এগিয়ে গিয়েছেন।

রোহিঙ্গাদের এই দুরবস্থার প্রধান কারণ মিয়ানমার সরকারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন, যে আইনে তাদের জাতীয়তার স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। রোহিঙ্গা মুসলমানরা খ্রিস্টীয় ১৫শ শতক বা তারও আগে থেকে আরাকানে আছে। ব্রিটিশরা ১৮২৬ সালে আরাকান দখল করে ‘বিভেদ করে শাসন কর’ নীতি অনুসরণ করে। ১৯৪০ এর দশকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বৌদ্ধরা জাপানিদের পক্ষে যায়। জাপানি সৈন্যরা এগিয়ে আসতে থাকলে ব্রিটিশরা সেখানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়োগ করে বাধা দেয়। মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যেকার সৃষ্ট এই শত্রুতার ফলে ১৯৪২-৪৩ সালে দাঙ্গা হয় ও উভয় পক্ষের হাজার হাজার লোক মারা পড়ে। এভাবে নৃতাত্ত্বিক ধারায় তারা পরস্পরবিরোধী হয়ে যায়। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীন হলে যুদ্ধরত অবস্থায় এই দুই গোষ্ঠীকে রেখে ব্রিটিশরা চলে যায়। এ সময় রোহিঙ্গারা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে তাদের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবে হতে হবে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, তাদের এই ঐতিহাসিক অধিকার ফিরে পেলে তারা নির্ভয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে নিজ বাড়িতে ফিরে যাবে। আমরা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়া, তাদের ফেলে আসা বাড়ি ও আবাদি জমি ফিরে পাওয়াসহ যথাযথ পুনর্বাসন বিষয়ে উভয় দেশের সরকারকে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে প্রস্তুত আছি। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বর্মী সামরিক জান্তা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের (মুসলমানদের) ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন আগস্ট ২০১৭ মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন ১৯৮২ সংশোধন করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ করেছে (পৃষ্ঠা ৬০)।

কফি আনান প্রতিবেদনে বলা হয় (পৃষ্ঠা ২৬), ২০১৪ সালে মুসলিমদের নাগরিকত্ব আবেদন ফরমে পূর্বপুরুষ বাঙালি লিখতে বলা হয়। এর ওপর আপত্তি হলে তা স্থগিত হয়ে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে তা আবার শুরু হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে তা বাতিল করে জুন মাসে নতুন ফরম দেওয়া হলে সেখানেও পূর্বপুরুষ বাঙালি লিখতে বলা হয়। এক বছর পর নতুন ফরম দেওয়া হয়, যাতে পূর্বপুরুষ বাঙালি লিখতে আর বলা হয়নি। কফি আনান রিপোর্টে রোহিঙ্গাদের ওপর পর্যায়ক্রমে কীভাবে নির্যাতন চেপে বসে তার বিবরণ দিয়ে বলা হয় (পৃষ্ঠা ৩০)

In 1989, a citizenship inspection process was carried out across Myanmar, and those found to meet the new requirements had their National Registration Cards (NRCs) replaced with new ‘Citizenship Scrutiny Cards’ (CSCs). The majority of Muslims in Rakhine with NRCs surrendered their documents, but were never issued with CSCs, rendering them de facto stateless. From 1995, the authorities began issuing Temporary Residency Card (TRCs, or ‘white cards’) to Muslims in Rakhine State who did not have identity documents, as well as to returning refugees. In early 2015, the Government invalidated all TRCs, and the Constitutional Tribunal ruled that TRC-holders were ineligible to vote. In the democratic elections in November 2015, Muslims from Rakhine were neither allowed to participate as candidates, nor as voters – unlike in all previous elections since independence in 1948..

রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিরসনে ২৩ নভেম্বর ২০১৭ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছে। বিবিসি বাংলা অনুযায়ী এই সমঝোতা দলিলে উল্লেখিত কিছু শর্ত :

১। ০৯-১০-১৬ ও ২৫-০৮-১৭-এর পরে বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী ‘বাস্তুচ্যুত রাখাইন রাজ্যের অধিবাসীদের’ ফেরত  নেবে মিয়ানমার। দুই মাসের মধ্যে প্রক্রিয়া শুরু হবে।

২। সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরের তিন সপ্তাহের মধ্যে দুই দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে এবং মাঠ পর্যায়ে প্রত্যাবাসনের শর্তাবলি চূড়ান্ত করা হবে।

৩। দু’পক্ষই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা টঘঐঈজ-এর সহায়তা নিতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ এখনই এই সংস্থাটির সহায়তা পাবে। মিয়ানমার প্রয়োজন অনুযায়ী টঘঐঈজ-কে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করবে।

৪। প্রত্যাবাসনকারীদের নাগরিকত্ব পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে। প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিলে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করবে। ১৯৯২ পরবর্তী প্রত্যাবাসন চুক্তি যাচাই প্রক্রিয়ার আদর্শ হিসেবে ধরা হবে।

৫। শুধুমাত্র স্বেচ্ছায় মিয়ানমার ফিরতে আগ্রহীরা এই সমঝোতার আওতাধীন হবে।

৬। অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় জন্ম নেওয়া (রাখাইনে ধর্ষণের কারণে) শিশুদের বাংলাদেশের আদালতের মাধ্যমে প্রত্যায়িত (সার্টিফাই) করতে হবে।

৭। প্রত্যাবাসনকারীদের প্রাথমিকভাবে সীমিত সময়ের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়স্থলে রাখা হবে।

৮। নাগরিকত্বের প্রমাণ উপস্থাপন করার সাপেক্ষে সকলকে ফেরত নেবে মিয়ানমার।

আন্তর্জাতিকভাবে যখন রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের এক ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে তখন বাংলাদেশ সরকারের ‘একনেক’ হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে এক লক্ষ রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের উদ্দেশে ২৩১২ কোটি টাকার আশ্রয়ন প্রকল্প পাস করেছে। আমরা মনে করি রোহিঙ্গাদের সীমান্ত এলাকা থেকে এনে ভাসানচরে স্থান দেওয়ার উদ্যোগ হঠকারী ও বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের উৎসাহ দেওয়া। আমরা ভাসানচরে নির্মিত বাড়িঘরে বরং বাংলাদেশের নদীভাঙন ও উন্নয়ন প্রকল্পে জমি হারানো নিঃস্ব মানুষদের পুনর্বাসন করতে পরামর্শ দিয়েছি।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সমস্যা সমাধান করতে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা ও কফি আনান প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এগোতে হবে। তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে মিয়ানমারে ফেরত নিতে হবে। এই লক্ষ্যে মিয়ানমারের প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন বা পরিবর্তন ও তাদের ভূমিতে পুনর্বাসন করতে দেরি হলে আমরা অবিলম্বে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো মিয়ানমার সীমান্তের ভেতরে সরিয়ে নিতে বলছি। আমরা একইসঙ্গে রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সামাজিক বিবাদ নিরসনের লক্ষ্যে উভয় দেশের নাগরিকদের যৌথ উদ্যোগ প্রস্তাব করছি।