বিমানবন্দরেই কাঁদলেন শেখ হাসিনা ও শেখ সেলিম

ব্রুনাই থেকে তিন দিনের সরকারি সফর শেষে গতকাল দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ও শেখ সেলিম শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলায় নিহত জায়ানের জন্য কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতে উপস্থিত মন্ত্রী-এমপিসহ সবাই এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। প্রধানমন্ত্রী শেখ সেলিমকে সান্ত¡না দেন এবং হাত ধরে বিমানবন্দর থেকে বের হন।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইটে সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে ব্রুনাইয়ের স্থানীয় সময় বিকেল সোয়া ৩টায় রাজধানী বন্দর সেরি বেগওয়ানের ব্রুনাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সফরসঙ্গীদের নিয়ে

দেশের পথে রওনা হন তিনি। বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানান ব্রুনাইয়ের প্রাইমারি রিসোর্স ও পর্যটনমন্ত্রী আলি বিন আপং এবং ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মাহমুদ হোসাইন। প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে স্ট্যাটিক গার্ড দেওয়া হয়।

ব্রুনাই সুলতান হাজি হাসানাল বলকিয়ার আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার ছয়টি সমঝোতা স্মারক সই এবং কূটনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের ভিসা ছাড়া ভ্রমণের সুযোগ দিতে কূটনৈতিক নোট বিনিময় হয়েছে। শেখ হাসিনা গত রবিবার দুপুরে ব্রুনাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। ওই দিন বিকেলে প্রবাসীদের দেওয়া এক সংবর্ধনা সভায় যোগ দেন তিনি।

সোমবার সুলতান বলকিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দুই নেতার উপস্থিতিতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সই হওয়া সমঝোতাগুলো হয়েছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, শিল্প ও সংস্কৃতি, যুব ও ক্রীড়া খাতের সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং এলএনজি ও এলপিজি সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে। বলকিয়ার সরকারি বাসভবন ইস্তানা নুরুল ইমানের চেরাদি লায়লা কেনচানায় রাজ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও মিলিত হন শেখ হাসিনা। ওই দিন সকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সুলতানের সরকারি বাসভবনে পৌঁছলে সুলতান বলকিয়া ও যুবরাজ হাজি আল মুহতাদি বিল্লাহ তাকে প্রটোকল ভেঙে স্বাগত জানান।

দুপুরে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের ফোরামে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। বিকেলে সেখানকার জামে আসর মসজিদ পরিদর্শন এবং সেখানে আসরের নামাজ আদায় করেন শেখ হাসিনা। রাতে সুলতান হাজি হাসানাল বলকিয়ার দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেন তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে ব্রুনাইয়ের রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকা জালান কেবাংসানে বাংলাদেশ হাইকমিশনের নতুন চ্যান্সেরি ভবনের ভিত্তি স্থাপন এবং রয়েল রেজালিয়া জাদুঘর পরিদর্শন করেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর ব্রুনাই সফরের শেষ দিন গতকাল বাংলাদেশ ও ব্রুনাই গতকাল এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেছে, দুই দেশ জ্বালানি খাতে সমম্বিত সহযোগিতার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সম্মত হয়েছে। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার জোগান দিতে বাংলাদেশে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহসহ সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় দুই দেশ জ্বালানি খাতে সমন্বিত সহযোগিতার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সম্মত হয়েছে।

এতে বলা হয়, পেট্রোকেমিক্যাল, সমুদ্রে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান, কারিগরি সহযোগিতা এবং সক্ষমতা উন্নয়নের মতো খাতে দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত সহযোগিতায় বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগাতে শেখ হাসিনা ও ব্রুনাইয়ের সুলতান হাজি হাসানাল বলকিয়া সম্মত হয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, দুই নেতা বিনিয়োগের সম্ভাবনার ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থে বিশেষ করে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, জ্বালানি, আইসিটি, জাহাজ নির্মাণ, ম্যানুফ্যাকচারিং, পর্যটন অবকাঠামো, ব্লু ইকোনমি এবং পাট শিল্পের মতো খাতে পারস্পরিক বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে সম্মত হয়েছেন।

ব্রুনাই দারুস সালাম বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক জোনের সুযোগ নিয়ে বিশ্বব্যাপী ‘হালাল ফুড মার্কেটে’ প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। হালাল ফুড শিল্পে ব্রুনাইয়ের দক্ষতা প্রমাণিত।

পারস্পরিক চুক্তি অনুযায়ী উভয়পক্ষ প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়নে স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে উভয় দেশ। বিশেষ করে প্রশিক্ষণ, হেলথ কেয়ার প্রফেশনাল নিয়োগ ও ওষুধ উৎপাদন এবং বাণিজ্যের পাশাপাশি বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতায় সম্মত হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগে কার্যকর সুযোগ-সুবিধা দিতে আর্থিক কার্যক্রম জোরদারে দুই দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রতি উভয়পক্ষ জোর দিয়েছে।

অভিন্ন স্বার্থ ও সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন ইস্যুতে জাতিসংঘ, ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি), কমনওয়েলথ এবং আশিয়ান আঞ্চলিক ফোরামসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সহযোগিতা আরও জোরদারে উভয়পক্ষ সম্মত হয়েছে। আশিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে অব্যাহত চেষ্টার প্রতি দুই নেতা সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং এই সম্পর্ক উন্নয়নে পারস্পরিক লাভবান হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে তারা সম্মত হয়েছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দেওয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের মানবিক সহযোগিতা প্রদান এবং তাদের প্রত্যাবাসন উদ্যোগের প্রতি ব্রুনাই দারুস সালাম সমর্থন দিয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক আচরণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টার জন্য ব্রুনাই বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে।

অব্যাহত সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য সুলতানের সরকার এবং কক্সবাজারে ফিল্ড হাসপাতালে জরুরি ওষুধ ও স্বাস্থ্য উপকরণ সরবরাহ এবং আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার জন্য ইয়াং ডি পারতুন অফ ব্রুনাই দারুস সালামের প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার বিচক্ষণ নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রবৃদ্ধি লাভ এবং সামাজিক খাতে অসামান্য সাফল্য অর্জন করায় ব্রুনাইয়ের সুলতান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেছেন। তিনি বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উন্নীত করা ও স্বীকৃতি লাভ করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ নির্ধারিত যোগ্যতার মানদ- সফলভাবে পূরণ করায় অভিনন্দন জানান।