রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা নৈতিক দায়িত্ব

পবিত্র রমজানের গুরুত্ব অনুযায়ী গোটা বিশ্বে অন্যরকম প্রস্তুতি থাকে। কারণ রমজান মাসে জীবন ধারা বদলে যায়। চলাফেরা ও খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে এক ধরনের শৃঙ্খলা চলে আসে। মানুষের কথাবার্তায়ও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে রমজান মাসে প্রতিটি ইমানদার রোজাদার যেন নির্বিঘ্নে ও অত্যন্ত সহজভাবে রোজার উপকারিতা ভোগ করতে পারে তার জন্য রাষ্ট্র সচেতন হয়। যেমন সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই রমজান উপলক্ষে দ্রব্যমূল্যের সহজলভ্যতার জন্য প্রায় ৫০% শতাংশ ছাড় দিয়ে থাকে। কিন্তু বিষয়টি আমাদের দেশে ব্যতিক্রম। রমজান আসার আগে থেকে আমাদের দেশের জনগণ এক ধরনের আতঙ্কে থাকেন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে। কারণ রমজান এলেই সব ধরনের দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। আর যে কারণে রোজাদাররা খুব কষ্ট করেন। দ্রব্যমূল্য চড়া থাকার কারণে অনেক রোজাদারই নির্বিঘ্নে রোজা রাখতে পারেন না। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের অবস্থা করুণ হয়ে যায়। অথচ রোজাদারদের কষ্ট দেওয়া অনেক বড় অপরাধ। বিষয়টি আমরা বুঝতেই পারি না। অর্থাৎ রোজার তাৎপর্য ও গুরুত্ব যেন আমরা বুঝতে রাজি নই!

রমজান মাসে বাণিজ্যের নামে মুনাফাখোরদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায় এবং দ্রব্যমূল্যের বাজারে নৈরাজ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করে ব্যক্তি স্বার্থে ফায়দা হাসিলের লক্ষ্যে নানা ধরনের বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট তৈরি করে দুরাচার প্রকৃতির মানুষ রমজানকে টার্গেট করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টিতে অপপ্রয়াস চালায়। এ বিষয়গুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর মনিটরিং যেমন থাকে না, তেমনি দ্রব্যমূল্য কমানোর কোনো সরকারি বিশেষ ঘোষণাও থাকে না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের মদদপুষ্ট ব্যক্তিরাই এ ধরনের দুর্নীতির বাজার সৃষ্টিতে বেপরোয়া হয়ে ওঠে, যা পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্যের বাজারে নৈরাজ্য ও ফেতনা সৃষ্টির জন্য দায়ী।

মাহে রমজানের শিক্ষা যেখানে দুর্নীতিরোধ ও চরিত্র সংশোধন করতে চায়। সেখানে কিছু কিছু লোক বেপরোয়া হয়ে দুষ্কৃতি ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটিয়ে নিজেদের ধ্বংস যেমন রচনা করে তেমনি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে নৈরাজ্য সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করে। এ সমস্ত অপরাধীকে চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে বয়কট করা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। কেননা জানমালের নিরাপত্তাদান খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা দানসহ সব ধরনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা একটি সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে এ দায়িত্ব আরও বহুগুণে বেড়ে যায়। অতএব সাধারণ জনগণ মনে করে এ বিষয়ে সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে যেগুলো অতীব প্রয়োজনীয় সেগুলোর মূল্য কমাতে উদ্যোগী হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি বাজারে সরকারের পক্ষ থেকে মনিটরিং সেল গঠন করে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার কথা চিন্তা করে একটি মূল্য তালিকা নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সাধারণ জনগণ প্রতিটি রোজা সহজভাবে রাখতে পারবে। নয়তো তাদের অর্ধাহারে-উপবাসে থেকে রোজা পালন করতে হবে। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা ততক্ষণ কোনো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যে চেষ্টা করবে।’  সুরা রাদ : ১১

তাই আসুন, দেশের মানুষের রোজা সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে প্রতিপালনের জন্য সরকার যেন সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়, বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বাজারদর রেখে আত্মশুদ্ধি ও সংযম সাধনার নৈতিক প্রশিক্ষণে সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় সে জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ রইল।

লেখক : মুফতি, শিক্ষক ও ইসলাম বিষয়ক লেখক।