৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত বিএনপির ছয়জনের মধ্যে জাহিদুর রহমান জাহিদ গতকাল বৃহস্পতিবার শপথ নিয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে জাহিদুর রহমান জাহিদ বলছেন, বহিষ্কার করলেও বিএনপির নিবেদিত কর্মী হিসেবেই তিনি তার কাজ চালিয়ে যাবেন। এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির নির্বাচিত এক সংসদ সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া বাকি চারজনই ৩০ এপ্রিলের মধ্যে শপথ নিতে পারেন।
সংবিধানে নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের দিন থেকে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে শপথ নেওয়ার যে বিধান রয়েছে সে হিসাবে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে সবাইকে শপথ নিতে হবে।
দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে জয়ী জাহিদুর রহমান জাহিদের শপথ নেওয়ার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে তার ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, জাহিদুরের শপথে বিব্রত মির্জা ফখরুল। কারণ, মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁওয়েরই সন্তান।
সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ শাখার পরিচালক তারেক মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, গতকাল সকালে জাহিদুর রহমান শপথ নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহের কথা জানিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে চিঠি দেন। দুপুর ১২টায় তাকে শপথ করান স্পিকার। শপথের পর তিনি সংসদেই ছিলেন; বিকেলে যোগ দেন অধিবেশনে।
গত ২২ এপ্রিল রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠক করেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। বৈঠকে শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন তারা। এ সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা শপথ নেবেন তাদের দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তও নেন তারা। এর মাত্র দুদিন পর গতকাল শপথ নিলেন জাহিদুর রহমান। বাকি রয়েছেন বগুড়া-৪ আসনের মোশাররফ হোসেন, বগুড়া-৬ আসনের মির্জা ফখরুল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশীদ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার।
গতকাল মির্জা ফখরুল ফোন রিসিভ না করলেও করেন আমীর খসরু। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, যারা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদে যাবেন, তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মী তাদের ‘বেইমান’ বলবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, গত ৭ মার্চ শপথ নেন মৌলভীবাজার থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত গণফোরাম নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর। এরপর ২ এপ্রিল শপথ নেন গণফোরামের প্রতীক উদীয়মান সূর্য প্রতীক নিয়ে জয়ী এম মোকাব্বির খান। শপথ নিয়ে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাদের বহিষ্কার করে গণফোরাম। এবার শপথ নিলেন বিএনপি নেতা জাহিদুর রহমান। তার বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ নির্বাচনের পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
আমীর খসরু বলেন, দলের মধ্যে এমন কিছু নেতা সবসময় থাকেন, যারা দলের দুর্দিনে নিজের সুবিধার কথা বিবেচনা করে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যান। বিগত ওয়ান-ইলেভেনের সময়ও কিছু নেতা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এসব নেতা আসবে যাবে। এতে দলের কোনো ক্ষতি হবে না। ক্ষতি হবে ওইসব ব্যক্তির। রাজনীতি ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগিতা না। রাজনীতি ম্যারাথন দৌড়ের মতো।
জাহিদুর রহমানের শপথের পর গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় বলেন, দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা শপথ নেবেন তারা ‘গণদুশমন’ হবেন। সময়মতো জনগণই তাদের বিচার করবে এবং সেটার জন্য তাদের অপেক্ষা করতে হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সংসদ সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাহিদুর রহমানের সঙ্গে গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত উকিল আবদুস সাত্তার ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসন থেকে নির্বাচিত আমিনুল ইসলামেরও শপথ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা শপথ নেননি। তবে শিগগিরই শপথ নেবেন। এ বিষয়ে উকিল আবদুস সাত্তার ও আমিনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, শপথ নিতে যাওয়ার বিষয়ে কাউকে তারা কথা দেননি। যাওয়ার কথাও ছিল না। তবে উকিল আবদুস সাত্তার জানান, তার ওপরে জনগণের চাপ রয়েছে।
শপথ নেওয়ার পর সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় জাহিদুর রহমান জানান, সংসদে গিয়ে তার প্রথম কাজ হবে বিএনপির কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি চাওয়া। শপথ নিলে দল বহিষ্কার করতে পারে জেনেই শপথ নিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ছাত্রজীবন থেকে দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে আমি বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিএনপি আমাকে বহিষ্কার করলেও আমি তো বিএনপি থেকে বহিষ্কার হব না। কর্মী হিসেবে থেকে যাব।’
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে গয়েশ্বর বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সাংসদ হওয়ার পর তিনি যদি ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তবে সংসদে তার আসন শূন্য হবে। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদে যোগ দিলে এবং ওই অবস্থায় দল তাকে বহিষ্কার করলে পরিণতি কী হবে, সে বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। এই সুযোগ নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামের দুজন শপথ নিয়েছেন। একই সুযোগ নিয়েছেন বিএনপির জাহিদুর রহমান।