গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে (জাগৃক) আসা সেবাপ্রার্থীদের দুর্ভোগ দেখে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়!’ তিনি নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চরণ করে বলেন, ‘হয় দুর্নীতিবাজরা থাকবে, না হয় আমি থাকব। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির ওপর জিরো টলারেন্স। দুর্নীতি দূর করতে তিনি সরকার গঠন করেছেন। সে সরকারের আমি একজন মন্ত্রী। আমার অধীনে কেউ দুর্নীতি করতে পারবে না।’
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে সেবা সহজীকরণবিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাগৃকের চেয়ারম্যান মো. রাশিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আখতার হোসেন, জাগৃকের সদস্য (প্রকৌশল ও সমন্বয়) এ এস এম ফজলুল কবির। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই জাগৃকের চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলাম ২৬টি সেবা সহজীকরণের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘একজন নাগরিক রাষ্ট্রের মালিক। আমি যখন দেখি সেই মালিক অসহায় অবস্থায় ঘুরছে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অথবা আমরা যারা ক্ষমতায় বসে আছি, আমাদের কাছ থেকে কাক্সিক্ষত আচরণ পাচ্ছে না, তখন আমার মনে হয় আমি নিজেও কষ্ট পাচ্ছি। তাই এ দীর্ঘসূত্রতার অবসান হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। মানুষের ভোগান্তি কমাতে হবে, সেবাকে সহজ করতে হবে। কাজে স্বচ্ছতা আনতে হবে, সততা আনতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে না পারলে দেশে অনেক বড় অট্টালিকা হতে পারে, কিন্তু কাক্সিক্ষত সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। নাগরিক তার মৌলিক অধিকার ফিরে পাবে না।’
তিনি বলেন, ‘রাজউকে নকশা পাসের জন্য বছরের পর বছর কেন ঘুরতে হবে? এই গৃহায়নেও অনেক ভোগান্তির কথা আমার জানা আছে। মানুষ এ দুই দপ্তর থেকে সেবা না পেয়ে বাইরে গিয়ে খুব সুখকর কথা বলে না। সেখান থেকে আমার মনে হলো যে অপবাদ মানুষ দুই সংস্থাকে দিচ্ছে তা একেবারেই অপবাদ নয়। এর অনেকাংশে সত্যতা পাওয়া যায়।’
তিনি আরও বলেন, আমি গবেষণা করতে শুরু করলাম কীভাবে মানুষের দুর্ভোগ কমানো যায়। যেমনÑ রাজউকের একটি নকশা পাস করাতে হলে বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন লাগে। যদিও ভবনটি গুলশানে হয়। কোন আমলে কে এই আইন করে গেছেন তা আমার জানা নেই। একটি ভবনের অনুমোদনের জন্য অনেক দপ্তর বাদ দিয়ে মাত্র চারটি করা হলো। এখন চিন্তা করলাম এ চারটি থেকেও ভোগান্তি থাকবে। তাই মে মাসের এক তারিখ থেকে নকশা পাস অনলাইনে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের অনলাইন ব্যবস্থা গৃহায়নেও নেওয়া হবে।
রেজাউল করিম বলেন, ‘আমি নিজে ঘুষ খাই না। কমিশন খাই না। কমিশন বাণিজ্যও করি না। আমার অধীনস্থ কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও ঘুষ খেতে দেব না, কমিশন বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট করতেও দেব না। সিন্ডিকেট বাণিজ্য বন্ধ। আমি সাড়ে তিন মাস হলো দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। অনেক কিছু টেকনিক্যাল বিষয় বুঝে উঠতে সময় লাগছে।’
উপস্থিত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তবে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ও রাজউকের বেশকিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমার কাছে রয়েছে। আমরা সবাইকে একটা সুযোগ দিয়েছি। ভুলত্রুটি মানুষের থাকে। আশা করব তারা অতীতের সব কিছু থেকে বের হয়ে আসবে। ভালো যদি না হয়, খুব শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিন্ডিকেট আমি ভাঙবই। যারা দুর্নীতি করছে আর মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলছে তারা হারিয়ে যাবে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘রাজউকে ১ হাজারের বেশি ফাইল পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা এর মধ্যে এ ধরনের ৭০০ ফাইল উদ্ধার করেছি। অনেকের ডেস্কের তালা ভেঙে ফাইল বের করেছি। আর বাকিগুলোর জন্য এক মাস সময় দিয়ে এসেছি। ফাইল বের হতে হবে। হয় ফাইল বের হবে, না হয় অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বের হয়ে যেতে হবে।’
দশ তলার ওপরে থাকা বহুতল ভবনের তথ্য সংগ্রহের অগ্রগতি সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটি নিয়ে কাজ চলছে। শুধু এতটুকু বলি অনেকের মুখোশ উন্মোচন করার জন্য জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আকারে আমরা ছাপাব। আরও বলে রাখি, মন্ত্রণালয় যে তদন্ত করছে সেখানে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। আমার রাজউকের কর্মকর্তারা, ব্যবসায়ীরা অথবা ডেভেলপাররা, কারা কারা জড়িত। অতীতে শুধু বিল্ডিং বানালে তা ভেঙে দেওয়া হতো। কিন্তু আমরা যারা বানানোর সহযোগী তাদের কিছু হতো না। এবার তদন্তের পরিসর অনেকটা প্রসারিত। তদন্তে যা বেরিয়ে আসবে, আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে তা জানাব।’