মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি চান নিহতদের স্বজনরা

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের পাঁচ বছর আজ শনিবার। চাঞ্চল্যকর এ মামলায় ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে গত বছরের ১৯ নভেম্বর। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন নূর হোসেন ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা তারেক সাঈদসহ আসামিরা। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পর আসামিরা দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে আলাদা আপিল করেন। আপিলের দ্রুত নিষ্পত্তি চায় সাত খুনে নিহতদের স্বজনরা। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্রপক্ষে আপিল শুনানির উদ্যোগ শুরু না হওয়ায় তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহিদ সরওয়ার কাজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসামিপক্ষের আবেদনে বা রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে অথবা আপিল বিভাগের উদ্যোগে (সুয়োমোটো) আপিল শুনানি হতে পারে। আমি যতদূর জানি, আসামিপক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তেমনি আমরাও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে কোনো নির্দেশ এখনো পাইনি।’  

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের লিঙ্ক রোডের নামাপাড়া এলাকা থেকে নিখোঁজ হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম। ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে ছয়জনের ও পরদিন একজনের লাশ ভেসে ওঠে। সাত খুনের ঘটনায় দুটি মামলা হয়। একটির বাদী নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং অপরটির বাদী আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল।

সাত খুন মামলায় ২০১৬ বছরের ১৬ জানুয়ারি নিম্ন আদালতের রায়ে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আসামিদের ডেথ রেফারেন্স অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে আসে। সাজার রায়ের বিরুদ্ধে ২৮ আসামি হাইকোর্টে আপিল করেন। ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট সাত খুন মামলায় ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দেয়। রায়ে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১১ আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ১৫ আসামি হলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র‌্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, দুই কোম্পানি কমান্ডার আরিফ হোসেন, এম মাসুদ রানা, র‌্যাব-১১-তে কর্মরত ল্যান্সনায়েক বেলাল হোসেন, হাবিলদার মো. এমদাদুল হক, আরওজি-১ মো. আরিফ হোসেন, ল্যান্সনায়েক হিরা মিয়া, সিপাহি আবু তৈয়ব আলী, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দু বালা, সৈনিক আবদুল আলিম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আল আমিন ও সৈনিক তাজুল ইসলাম।

সাজা পাল্টে যাবজ্জীবন পাওয়া আসামিরা হলেনÑ র‌্যাব ১১ তৎকালীন সৈনিক আসাদুজ্জামান নুর, সার্জেন্ট এনামুল কবির, নূর হোসেনের সহযোগী আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান, রহম আলী, আবুল বাশার, মোর্তুজা জামান, মো. সেলিম, সানাউল্লাহ, মো. শাহজাহান ও মো. জামালউদ্দিন। এ ছাড়া বিচারিক আদালতের রায়ে ৯ আসামিকে দেওয়া বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড হাইকোর্ট বহাল রাখে। মামলার বিচারের দুটি ধাপ পেরিয়ে গেলেও এখনো পলাতক আছেন দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি। এদের মধ্যে তিনজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও দুজন যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত।

গত মার্চে হাইকোর্টের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে আপিল করা হয়েছে জানিয়ে তারেক সাঈদের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, প্রক্রিয়া শেষে আপিল শুনানির জন্য প্রস্তুত হবে। শুনানির জন্য প্রস্তুতের পর ক্রমানুসারে তালিকায় এলে আপিলের ওপর শুনানি হবে।

নূর হোসেনের আইনজীবী এস আর এম লুৎফর রহমান আকন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আপিল এখনো কার্যতালিকায় আসেনি। আমরা শুনানির অপেক্ষায় আছি। মৃত্যুদণ্ড বহালের রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে আরিফ হোসেনও আপিল করেছেন বলে জানান তার আইনজীবী এস এম শাহজাহান। অপর আসামি এম মাসুদ রানার আইনজীবী ফরহাদ আব্বাস বলেন, গত ৭ ফেব্রুয়ারি মাসুদ রানা আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৃথক আপিল করেছেন। সেটি শুনানির অপেক্ষায় আছে।

আপিল শুনানিতে দীর্ঘসূত্রতায় শঙ্কা প্রকাশ করে নিহত কাউন্সিলর নজরুলের এক আত্মীয় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নূর হোসেনের লোকজন এলাকায় প্রচার করছে তারা মামলার রায় ডিপ ফ্রিজে নিয়ে যাবে। নূর হোসেন আপিল করেছেন। তিনি মুক্তি পেয়ে এলাকায় ফিরে আসবেন। তাদের সব কার্যক্রম আগের মতো চলবে। কারাগার থেকে তাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন নূর হোসেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী লোকজন এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসাসহ তাদের কার্যক্রম আগের মতোই চালিয়ে যাচ্ছে।’

হত্যা মামলার বাদী ও নিহত নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই আমরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি। বাবার লাশ দেখার পর থেকেই আমার ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাকে প্রতিনিয়ত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসক দেখাতে হয়।’ নিহত স্বপনের ভাই রিপন বলেন, ‘মামলার আপিল শুনানি নিয়ে দীর্ঘসূত্রতায় আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। আমরা দ্রুত আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, নূর হোসেন কারাগারে থাকলেও মোবাইল ফোনে ভাই নূর উদ্দিনসহ অনুসারীদের আদেশ-নির্দেশ দিয়ে থাকেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, ‘কারাবন্দিরা মোবাইলে কথা বলার বিরুদ্ধে আমরা সতর্ক আছি। এর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে।’  

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নূর হোসেনের ভাই নূর উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নূর হোসেনের সঙ্গে কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে দেখা করি। তিনি মোবাইলে কথা বলেন বিষয়টি সঠিক নয়। আল-হামদুলিল্লাহ এলাকার সবকিছু ঠিকাঠক ও ভালো চলছে।’