সিপিএম পলিটব্যুরো সদস্য তথা বিদায়ী সাংসদ মহম্মদ সেলিম যতই বলুন ‘ভূতের মুখে রাম নাম’, এই বাংলায় বিনা যুদ্ধে যে সূচ্যগ্র মেদিনীও ছাড়তে নারাজ তারা, সে কথা বুঝিয়ে দিচ্ছে বিজেপি। উগ্র হিন্দুত্ববাদী চরম দক্ষিণপন্থি ভাবধারার অনুসারী, তবু বিজেপির কাছে চলতি নির্বাচনী লড়াইয়ে ব্রাত্য নয় এমনকি মুসলিম ভোটও। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ‘মুসলিম তোষণের’ অভিযোগ বরাবরই বিজেপির এক বড় অস্ত্র। এবার সেই অস্ত্রই অন্যভাবে প্রয়োগ করে মমতার বিরুদ্ধে ‘মুসলিম বঞ্চনার’ অভিযোগ আনল তারা।
হিন্দুত্বের ভাবাবেগের বাতাস পালে লাগিয়ে যখন তরতর করে এগোচ্ছে বিজেপির নির্বাচনী রণতরী, তখন আলটপকা ‘মুসলিম-দরদি’ মন্তব্য করে ফের একটা রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। তার কথায়, ‘বাংলায় মুসলিমদের দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অপরাধপ্রবণতার জন্য দায়ী যদি কেউ হয়, তাহলে তা কংগ্রেস, বাম ও
তৃণমূল। এ ব্যাপারে বিজেপির কোনো দায় নেই, কেননা দল কখনই এ রাজ্যে শাসনক্ষমতায় ছিল না।’ এখানেই না থেমে দিলীপবাবু বলেছেন,
‘তৃণমূল থেকে শুরু করে কংগ্রেস ও বাম শাসকরা মুসলিমদের বরাবর ভোটব্যাংক হিসেবেই ব্যবহার করে এসেছে, তাদের উন্নয়নে কখনো নজর দেওয়া হয়নি।’
কলকাতা প্রেস ক্লাবে ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে বিজেপির রাজ্য সভাপতির মুখ থেকে এই বাক্য খসতে-না-খসতেই শুরু হয়ে গেছে বিতর্ক। রাজ্যের পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম বলেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুসলিম তোষণকারী বলে যারা এত দিন গালিগালাজ করতেন, তাদের অবশেষে শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে।’ ফিরহাদের কটাক্ষ, এবার বিজেপিই মুসলিম তোষণ শুরু করেছে।
সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম বলেন, ‘এ যেন ভূতের মুখে রাম নাম। পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতি করতে গেলে মুসলিম-মুসলিম করতেই হবে, এ কথাই মনে করছেন বিজেপি নেতারা। কিন্তু গোটা দেশে এই বিজেপি জমানায় মুসলিমদের কী হাল, তা সবাই জানে না।’ প্রায় একই সুরে দিলীপবাবুকে কটাক্ষ করেছেন রাজ্য কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা আবদুল মান্নান। তার প্রশ্ন, ‘গোটা দেশে মুসলিমদের কারা দাবিয়ে রাখছে? কারা কথায় কথায় মুসলিমদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দিচ্ছে?’
সেলিম-মান্নানের সুরেই যেন সুর মিলিয়ে সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের নেতা মহম্মদ কামরুজ্জামান বলেছেন, ‘উন্নয়ন নয়, এই মুহূর্তে গোটা দেশে মুসলিমদের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো, নিরাপত্তা।’
কিন্তু এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন দিলীপবাবু। শুধু হিন্দু ভোটে তৃপ্ত না থেকে তারা যে মুসলিম ভোটেও থাবা বসাতে চান, তা তার মন্তব্যে স্পষ্ট। বলেছেন, ‘বিজেপি সম্পর্কে মুসলিমদের মনে অযথা ভীতির সঞ্চার করানো হচ্ছে। আমাদের নীতিÑ সব কা সাথ সব কা বিকাশ। মুসলিমরা এর বাইরে নন। তাই সংখ্যালঘুদের কাছে আমার আবেদন, চোখ দিয়ে দেখুন, কান দিয়ে নয়।’
বিজেপি নেতার আরও দাবি, প্রচারে গিয়ে তিনি মুসলিমদের মধ্যেও বিজেপি সম্পর্কে এক ‘আবেগ’ লক্ষ করেছেন। বলেছেন, গত পঞ্চায়েত নির্বাচনেও প্রায় সাড়ে ৮০০ মুসলিমকে প্রার্থী করেছিল বিজেপি, তার মধ্যে জয়ী হয়েছেন ৭০-৮০ জন। সুতরাং গেরুয়া শিবিরে মোটেই ব্রাত্য নন মুসলিমরা।
এই বাংলায় ২৭.৩৫ শতাংশ মুসলিম ভোট। রাজ্যের অন্তত আটটি লোকসভা কেন্দ্রে মুসলিমরা হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ, না হয় হিন্দু জনসংখ্যার কাছাকাছি। রায়গঞ্জ, মালদা উত্তর ও দক্ষিণ, জঙ্গিপুর, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ, বসিরহাট ও বীরভূমে মুসলিম ভোট অন্যতম বড় ফ্যাক্টর। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই পাটিগণিতে চোখ রেখেই মুসলিমদের প্রতি এহেন নরম অবস্থান তুলে ধরতে চাইছে বিজেপি। ভোট বড় বালাই।
চলতি নির্বাচনে বাংলায় সাকল্যে দুজন মুসলিম প্রার্থী দিয়েছে বিজেপিÑ জঙ্গিপুরে মাফুজা খাতুন এবং মুর্শিদাবাদে হুমায়ুন কবীর। এরা দুজনই অন্য দল ভেঙে আসা পোড়-খাওয়া রাজনীতিক। প্রথমজন এসেছেন সিপিএমের ঘর ভেঙে এবং দ্বিতীয়জন কংগ্রেস থেকে তৃণমূল হয়ে শিবির পাল্টাতে পাল্টাতে এখন বিজেপিতে। তবে এই দুই কেন্দ্রেই ভোট-পর্ব সাঙ্গ হয়েছে। সংখ্যালঘু প্রার্থী দিয়ে বিজেপির এই রণকৌশল ভোটের ফলে সোনার ফসল তুলতে পারে কি না, তা জানা যাবে ২৩ মে, ভোট গণনার দিন।
রামমন্দির, গোরক্ষা, বালাকোট এয়ারস্ট্রাইক করে যতই হিন্দুত্ব ও জাতীয়তাবাদের হাওয়া গরম করুক না কেন বিজেপি, ভারতের জনবিন্যাসের যে চেহারা তাতে বৃহৎ এক সম্প্রদায়কে দূরে সরিয়ে রেখে নির্বাচনী লড়াইয়ে বেশিদিন লাভ ওঠানো যাবে না, তা বুঝছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও। তাই হাতে মেরে, ভাতে মেরেও মুসলিমদের মন ভোলানোর চেষ্টা। এমনটাই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে সারা দেশে ৪৮২ জন বিজেপি প্রার্থীর মধ্যে মুসলিম প্রার্থী ছিলেন সাকল্যে সাতজন। জিততে পারেননি কেউই। বিদায়ী ষোড়শ লোকসভায় বিজেপির মুসলিম সাংসদ নেই একজনও। তবে বেড়েছে মুসলিম ভোটপ্রাপ্তির হার। ২০০৯-এ বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ৪ শতাংশ মুসলিম ভোট, ২০১৪ সালে যা বেড়ে হয় ৯ শতাংশ। অন্যদিকে, কংগ্রেসের প্রাপ্ত মুসলিম ভোট এই পাঁচ বছরের ব্যবধানে রয়ে গেছে একই, ৩৮ শতাংশ।
২০১৯-এর ভোটের ফল প্রকাশের পর এই রেখাচিত্রটা কী দাঁড়ায় তা-ই হবে লক্ষণীয়।