সকালে একমাত্র শিশুসন্তান রুম্মানকে (৮) স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন মা জান্নাতুল ফেরদৌস (৩২)। একটি সিএনজি অটোরিকশায় চার যাত্রীর সঙ্গে ছিলেন মা-ছেলে। পথিমধ্যে কার্ডোভা পরিবহনের একটি বাস চাপা দিলে ছিটকে পড়েন যাত্রীরা। শিশু রুম্মান ঘটনাস্থলে মায়ের কোলে থেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। মাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় অটোরিকশার আরও চার যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন। গতকাল রবিবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার কাকৈরতলা এলাকার এ দুর্ঘটনা ঘটে। কুমিল্লা লাকসামের মুদাফফরগঞ্জ থেকে অটোরিকশাটি শাহরাস্তি যাচ্ছিল।
শিশু রুম্মন শাহরাস্তির কালিয়াপাড়া এলাকায় ‘কালিয়াপাড়া বিদ্যানিকেতন’ স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্র ছিল। কচুয়া উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের জান্নাতুল ফেরদৌস ও আহসান মোল্লা দম্পতির একমাত্র সন্তান ছিল রুম্মান। বাবা আহসান মোল্লা কুয়েতপ্রবাসী। গত ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি চার মাসের ছুটিতে বাড়ি আসেন। আগামী জুন মাসে কুয়েত ফিরে যাওয়ার আগেই সড়কে হারালেন স্ত্রী-সন্তান।
আহসান মোল্লা বলেন, ‘আমার সন্তানকে স্কুলে রেখে স্ত্রী তো বলেছিল বাড়ি ফিরে আসবে। সে তো ফিরে এলো না। কাদের নিয়ে আমি এখন বাঁচব। কে আমার কাছে চকলেট খাওয়ার আবদার জানাবে। কার জন্য আমি বিদেশ থেকে খেলনা নিয়ে আসব।’
এদিকে বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও সাতজন। লক্ষ্মীপুরে মজুচৌধুরীর হাট সড়কে পিকআপ ভ্যানের চাপায় ইয়াছিন হোসেন (৯) নামে এক মাদ্রাসাছাত্র নিহত হয়েছে। সে স্থানীয় হামিদ মিয়াজী মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র ও একই এলাকার বাবুল মিয়ার ছেলে। এ ঘটনার প্রতিবাদে মজুচৌধুরীর হাট সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা নিরাপদ সড়ক ও ইয়াছিন হত্যার বিচারের দাবি জানান। পরে পুলিশ গিয়ে আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ তুলে নেন।
গতকাল সকালে গাজীপুরের কালীগঞ্জে তিতাস পরিবহনের একটি বাসের হেলপার বাস থেকে পড়ে ওই বাসের চাপায় নিহত হয়েছেন। নাটোরের পিটিআই বাইপাস এলাকায় বাসচাপায় অটোরিকশার যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন। চুয়াডাঙ্গার ভালাইপুর মোড় এলাকায় ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। ফেনীর ফুলগাজীতে সকালে ট্রাক-সিনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে এক ব্যবসায়ী, পাবনার
ঈশ্বরদীতে অটোরিকশার ধাক্কায় বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। এর আগে শনিবার রাতে নওগাঁয় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের এক হাবিলদার নিহত হন। বিস্তারিত প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :
ছেলেসহ ছয়জন নিহত : চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে বাস-সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-ছেলেসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। গতকাল সকাল ৯টার দিকে উপজেলার কাকৈরতলা এলাকার চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেনÑ কচুয়া উপজেলার ভবানিপুরের জান্নাতুল ফেরদৌস (৩২) ও তার ছেলে রুম্মান হোসেন (৮), পিপলকড়ার রনজিত মজুমদার (৫৩), কচুয়ার শাহজাহান (৫২), ফখরুল ইসলাম (৭৫) ও শাহরাস্তির শাহপুর গ্রামের আবুল কালাম (৬০)।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, লাকসামের মুদাফফরগঞ্জ থেকে একটি অটোরিকশা ছয়জন যাত্রী নিয়ে শাহরাস্তি যাওয়ার পথে কাকৈরতলা এলাকায় টঙ্গীগামী কর্ডোভা পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলে চারজন আর হাসপাতালে অন্যরা মারা যান।
শাহরাস্তি থানার ওসি শাহ আলম বলেন, গতকাল সকালে কাকৈরতলা এলাকায় বাস-সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষের খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে যাই। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে চারজন মারা যান। চালকসহ আহত তিনজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার সময় জান্নাতুল মারা যান। আর কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় শাহজাহানের। বাসটি জব্দ করা গেলেও চালক ও হেলপারকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান ওসি।
এদিকে দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসক মাজেদুর রহমান খানসহ অন্য কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।
বিভিন্ন স্থানে নিহত আরও ৭ : লক্ষ্মীপুরে মজুচৌধুরীর হাট সড়কে পিকআপ ভ্যানের চাপায় ইয়াছিন হোসেন নামে এক মাদ্রাসাছাত্র নিহত হয়েছে। লক্ষ্মীপুর সদর থানার ওসি লোকমান হোসেন জানান, মাদ্রাসাছাত্র নিহতের ঘটনার প্রতিবাদে মজুচৌধুরীর হাট সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা নিরাপদ সড়ক ও ইয়াছিন হত্যার বিচারের দাবি জানান। পরে পুলিশ গিয়ে আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ তুলে নেন।
গাজীপুরের কালীগঞ্জে তিতাস পরিবহনের একটি বাসের হেলপার বাস থেকে পড়ে ওই বাসের চাপায় নিহত হয়েছে। কালীগঞ্জ থানা পুলিশের ওসি আবু বকর মিয়া জানান, গতকাল সকালে টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কের আড়িখোলা এলাকায় তিতাস পরিবহনের হেলপার ফারুক হোসেন (২৮) একই বাসের চাপায় নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় বাসের এক নারী যাত্রী আহত হন। ফারুক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার বাঁশগাড়ি গ্রামের মোহাম্মদ হোসেনের ছেলে।
নাটোরের পিটিআই বাইপাস এলাকায় বাসচাপায় অটোরিকশার যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন। নাটোরের পশ্চিমাঞ্চল হাইওয়ে থানার ইনচার্জ মোজাম্মেল হক জানান, গতকাল বেলা ১১টার দিকে সদর উপজেলার পিটিআই বাইপাস মোড় এলাকায় দ্রুতগতির বাস একটি অটোরিকশাকে চাপা দেয়। এ সময় অটোর দুই যাত্রী ছিটকে পড়েন। তাদের জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক বাদল মিয়াকে (৪০) মৃত ঘোষণা করেন। তিনি উপজেলার রামপুর গ্রামের আমজাদ আলীর ছেলে। আহত নুর আলমকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
নওগাঁয় মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের এক হাবিলদার নিহত হয়েছেন। নওগাঁ ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক এ কে এম মোরশেদ জানান, গত শনিবার রাতে নওগাঁ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সামনে দ্রুতগামী একটি মোটরসাইকেলের ধাক্কায় মাহবুব হাসান নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। তিনি জয়পুরহাট ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের হাবিলদার ছিলেন। পাবনার ঈশ্বরদীতে অটোরিকশার ধাক্কায় বৃদ্ধ নিহত হয়েছেন। ঈশ্বরদী থানার ওসি বাহাউদ্দিন ফারুকী জানান, গতকাল দুপুরে শহরের ফতেমোহাম্মদপুর এলাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় চাঁদ আলী মৃধা নামে ওই বৃদ্ধ নিহত হন। তিনি ফতেমোহাম্মদপুর হিন্দুপাড়া এলাকার মোবারক আলী মৃধার ছেলে।
ফেনীর ফুলগাজীতে সকালে ট্রাক-সিনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে এক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। ফেনীর ফুলগাজী থানার এসআই সেলিম জানান, গতকাল সকালে ফেনী-পরশুরাম সড়কের হাসানপুর এলাকায় ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে খোরশেদ আলম (৪৫) নামে এক ব্যবসায়ী নিহত হন। তিনি উপজেলার দক্ষিণ আনন্দপুর গ্রামের আবদুর রাজ্জাকের ছেলে।
চুয়াডাঙ্গা ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক আবদুস সালাম জানান, চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর সড়কের ভালাইপুর মোড় এলাকায় ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে শান্তি মিয়া (৩০) নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। গতকাল সকালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি সদর উপজেলার মাখালডাঙ্গা গ্রামের আছিরউদ্দিনের ছেলে।