প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারিতে সূচক পুনরুদ্ধার শুরু

পুঁজিবাজারে টানা দরপতনের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারসাজিকারকদের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি দেওয়ার পর হারানো মূল্যসূচক পুনরুদ্ধার শুরু হয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পুঁজিবাজার বিষয়ে বক্তব্যের পর গতকাল বৃহস্পতিবার সূচকের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন হওয়া ৭৯ শতাংশ শেয়ারের দরবৃদ্ধিতে প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে ৮৩ পয়েন্ট। বেড়েছে কেনাবেচার পরিমাণও।

টানা দরপতনের প্রেক্ষিতে গত ৩০ এপ্রিল রাতে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পুঁজিবাজার নিয়ে খুব বেশি শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বাজার স্থিতিশীল করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কেউ যদি বাজার নিয়ে ‘গেম’ খেলতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং হবে। পুঁজিবাজারে কারসাজিকারকদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর এমন হুশিয়ারির পর গতকাল ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। লেনদেনের শুরু থেকেই সূচকের ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখা যায়। দিনশেষে ডিএসইর প্রধান সূচকে ৮৩ পয়েন্ট যোগ করে লেনদেন শেষ হয়। এর আগে ২৯ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, বিএসইসি চেয়ারম্যান ড. খায়রুল হোসেন, এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে পুঁজিবাজারে টানা দরপতন রোধে করণীয় নিয়ে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পরদিন পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানায় বিএসইসি। গতকাল আসন্ন বাজেটে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা জানান এনবিআর চেয়ারম্যান। এর আগে অর্থমন্ত্রীও পুঁজিবাজারের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হবে বলে জানান। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাজারে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৭৯ শতাংশ সিকিউরিটিজের দরবৃদ্ধিতে ডিএসইএক্স ৮৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫২৮৬ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শেষ দুই কার্যদিবস সূচক বাড়ার কারণে টানা ১৩ সপ্তাহের দরপতনের পর ১৪তম সপ্তাহে এসে সব ধরনের সূচকে বাড়তি পয়েন্ট যোগ হয়েছে। চলতি সপ্তাহ শেষে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক বেড়েছে ২০ পয়েন্ট। আগের সপ্তাহে এ সূচকটি ৫৫ পয়েন্ট হারিয়েছিল।

গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৪৮টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর বেড়েছে ২৭৫টির, কমেছে ৪৯টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ২৪টির। ৭৯ শতাংশ সিকিউরিটিজের দরবৃদ্ধিতে গতকাল সবগুলো খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে। এতে এক দিনে ডিএসইর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বাজার মূলধন পুনরুদ্ধার হয়েছে। বাজার মূলধন বাড়াতে বেশি ভূমিকা রেখেছে উৎপাদন খাত।

গতকাল দিনের লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বিবিধ খাতের শেয়ারদর। গতকাল ডিএসইতে এ খাতটির বাজার মূলধন বেড়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। তথ্যপ্রযুক্তি খাত ৪ দশমিক ৬ শতাংশ, ভ্রমণ ও অবকাশ খাত ৩ দশমিক ৯ শতাংশ, সিরামিক ৩ দশমিক ৪ শতাংশ ও এনবিএফআইয়ের ৩ দশমিক ২ শতাংশ দর বেড়েছে। এছাড়া গতকাল অধিকাংশ ব্যাংকের শেয়ারের দর কমলেও খাতটির বাজার মূলধন বেড়েছে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের দর বেড়েছে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। এর বাইরে ইউনাইটেড পাওয়ারের দরবৃদ্ধির কারণে জ¦ালানি খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে ১ দশমিক ৮ শতাংশ। একক কোম্পানি হিসেবে সবচেয়ে বেশি দর বেড়েছে ঢাকা ইন্স্যুরেন্সের। গতকাল এ কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করায়  কোনো সার্কিট ব্রেকার না থাকায় ১২ দশমিক ৪ শতাংশ দর বেড়েছে। এছাড়া বিডিকমের শেয়ারদর বেড়েছে ১০ শতাংশ। গতকাল সূচকের উল্লম্ফনে লোকসানি কোম্পানির শেয়ারদরও বেড়েছে। জিকিউ বলপেন লোকসানে থাকলেও গতকাল শেয়ারটির দর বেড়েছে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। এছাড়া ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের আয়ের ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ৯ দশমিক ৯ শতাংশ। লেনদেনের শুরুতে এ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দেখানো হয় ১ টাকা ৩৮ পয়সা, যা লেনদেন শেষে ইপিএস সংশোধন করে ৬৫ পয়সা দেখানো হয়। তৃতীয় প্রান্তিকে ইউনাইটেড পাওয়ারের আয় ৮৩ শতাংশ বাড়ায় বিদেশিদের কাছে শেয়ার বিক্রির অনুমোদন বাতিলের পরও গতকাল দর বেড়েছে ১২ টাকা ৭০ পয়সা।

এদিকে সূচকের উল্লম্ফনে গতকাল লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ৪৭০ কোটি টাকার শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিট, যা আগের দিনের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি। ডিএসইর লেনদেনের ৬৪ শতাংশ এসেছে প্রকৌশল, ফার্মাসিউটিক্যালস, ব্যাংক, বস্ত্র ও জ¦ালানি খাতের শেয়ার থেকে। একক কোম্পানি হিসেবে লেনদেনের শীর্ষে ছিল ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। গতকাল এ কোম্পানিতে ২৭ কোটি ২৮ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। এছাড়া লেনদেনের পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে ফরচুন সুজ, মুন্নু সিরামিক, গ্রামীণফোন ও ন্যাশনাল পলিমার।