বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘ফণি’। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যমতে গতকাল মধ্যরাতে দেশের খুলনা ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এই ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত হানবার কথা। ইতিমধ্যে তা ভারতের ওড়িশা রাজ্যে তাণ্ডব চালিয়েছে এবং সেখানে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ল-ভ- হয়েছে পুরী-ভুবনেশ্বরসহ সংলগ্ন বিস্তৃত এলাকা।
আবহাওয়াবিদদের মতে, গত ৪৩ বছরের মধ্যে এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। ঘণ্টায় ১৮০ কিলোমিটার বাতাসের শক্তি আর হাজার কিলোমিটার ব্যাসের বিস্তার নিয়ে ধেয়ে আসা এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে চার থেকে পাঁচ ফুটের বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। মোংলা ও পায়রা বন্দরকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখানো হয়েছে। এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে শক্তিশালী জোয়ারের ফলে দেশের দুটি উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালী ও বাগেরহাটের ২৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আরও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে এখন ঘূর্ণিঝড়ের যাত্রাপথ, তার গতি, সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ইত্যাদি সম্পর্কে আগেভাগে জানা যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকেও ঘূর্ণিঝড় ‘ফণি’ মোকাবিলায় বেশ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। উপকূলের ১৯ জেলায় নানা প্রস্তুতি নিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এই জেলাগুলোতে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে এবং ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই সব জেলার ৩ হাজার ৮৬৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রথমে নারী, শিশু ও বয়স্কদের নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উপকূলীয় জেলার জেলা প্রশাসকদের কাছে ২০০ মেট্রিক টন চাল পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। জরুরি সহায়তার জন্য ৫ লাখ টাকা জেলা প্রশাসকদের কাছে দেওয়া আছে। প্রতিটি উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সওজ, এলজিইডিসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থাকে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল। ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে যে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, তাতে ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। এরপর ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের ১ লাখ ৩৮ হাজার প্রাণহানি ঘটেছিল। সেই সময় ঝড়ের পূর্বাভাস পৌঁছানোর মতো যথাযথ প্রক্রিয়া ছিল না বলে এত প্রাণহানি ঘটত। এখন বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় অনেক সক্ষমতা অর্জন করেছে। তার পরও ২০০৭ সালে সিডর এবং তার দুই বছর পরের আইলাতে ব্যাপক জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তাই ঘূর্ণিঝড় ‘ফণি’ যাতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না ঘটাতে পারে, সেজন্য সরকারের তরফ থেকে যেমন প্রস্তুতি রাখতে হবে তেমনি জনগণকেও সহযোগিতা করতে হবে। সরকার ও আবহাওয়া দপ্তরের নির্দেশনা মেনে আগে থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিতে পারলে প্রাণহানি শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব।
তবে উপকূলীয় এলাকায় অবকাঠামোগত ও অনবকাঠামোগত বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে, ঘূর্ণিঝড়ে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা ও সেসবের মধ্যে সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় কম। আশ্রয়কেন্দ্রে গৃহপালিত পশুপাখি ও অন্যান্য সম্পদ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনেকে সেখানে আশ্রয় নিতে চায় না। বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। উপকূলীয় অনেক নদী বরাবর ঘন ও বিস্তৃত বনের বেষ্টনী তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই যেকোনো দুর্যোগের পর দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালানোর মতো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে হবে। উপকূল অঞ্চলের সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানবন্দর, তেল রিজার্ভার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র-এসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর কারও হাত নেই। তবে আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। সরকার, সংশ্লিষ্ট সকলে এবং জনগণ মিলে এবারের এই ঘূর্ণিঝড় ‘ফণি’ মোকাবিলায় সক্ষম হবে এবং জানমালের যথাসম্ভব কম ক্ষয়ক্ষতি হবেÑ এটাই সকলের প্রত্যাশা।