সৌদিতে নিহত ১০ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে

সুখের আশা শোকে স্তব্ধ

সৌদি আরবের শাকরা শহরে বাস উল্টে নিহত ১০ বাংলাদেশির পরিচয় জানা গেছে। দেশটিতে বাংলাদেশ দূতাবাস গতকাল শুক্রবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত বুধবার সকালে রিয়াদ থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে শাকরায় ১৭ বাংলাদেশিকে বহনকারী একটি মিনিবাস চাকা ফেটে উল্টে যায়। এতে ১০ জন নিহত হন। তারা আল হাবিব কোম্পানি ফর ট্রেডিং কমার্শিয়াল কন্ট্রাক্টস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।

নিহতরা হলেন টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার ঝাগরমান এলাকার হাবেজ উদ্দিনের ছেলে বাহাদুর ও কস্তুরিপাড়া এলাকার শামসুল হকের ছেলে মনির হোসেন, কুষ্টিয়ার ভেড়ামাড়া উপজেলার মাধবপুরের আনোয়ার হোসেনের ছেলে রফিকুল ইসলাম, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রঘুনাথপুরের আবদুল খালেকের ছেলে ইউনুস আলী, নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার তারাকান্দি এলাকার মান্নান মাঝির ছেলে জামাল উদ্দিন মাঝি, তাতারদি এলাকার রশিদের ছেলে ইমদাদুল ও দমনমারার আবদুল মান্নান শেখের ছেলে আল আমিন, নওগাঁর মান্দা উপজেলার তেগরা এলাকার তফিজউদ্দিন মৃধার ছেলে গিয়াসউদ্দিন মৃধা ও তুরুকবাড়িয়া এলাকার রমজান আলীর ছেলে মানিক এবং কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার বাহাদিয়া এলাকার গিয়াসউদ্দিনের ছেলে জুয়েল।

দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত দুজন হলেনÑ টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার বলদি এলাকার নায়েব আলীর ছেলে নুরুল ইসলাম ও কুষ্টিয়ার ভেড়ামাড়া উপজেলার জুনিয়াদহ এলাকার ফজলু শেখের ছেলে রশিদুল ইসলাম। এর মধ্যে নুরুল রিয়াদের প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আবদুল আজিজ হাসপাতালে আর রশিদুল কিং সউদ

মেডিকেল সিটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এ ছাড়া কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার ডাংরি এলাকার মাসুদ মিয়ার ছেলে নাজমুল ও পাকুন্দিয়ার ছাইয়া আলাদি বাজার এলাকার মেনু মিয়ার ছেলে রায়হান মিয়া, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার উরপার আবদুর রশিদের ছেলে ইউসুফ আলী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের আয়ুবপুরের ফরিদ মিয়ার ছেলে ফুল মিয়া প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। রাজিব নামে একজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিলেও তার বিস্তারিত পরিচয় জানা যায়নি।

এদিকে নিহতদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে

ভাগ্যের সন্ধানে গিয়ে লাশ হলেন তারা : নরসিংদীর মনোহরদীতে তিনজনের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষদের হারিয়ে দিশেহারা তিন পরিবার। সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে এক মাস আগে সৌদি আরব পাড়ি জমান তারা। মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছার পর থেকে বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। স্বজন হারানোর শোকে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবার।

নিহত তিনজন হলেন মনোহরদী উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রামের জামাল উদ্দিন মাঝি, শেখেরগাঁও গ্রামের ইমদাদুল ও খিদিরপুর দোমনমারা গ্রামের মো. আল আমিন।

নিহত জামালের ভাই কামাল বলেন, ‘৪ লাখ টাকা ঋণ করে মাত্র ২৯ দিন আগে সৌদি আরব যায় জামাল। তার চার ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। দেশে তরকারি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত। সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে বিদেশে পাড়ি জমায়। কিন্তু ভাগ্যে সহায় হইল না।’

নিহত ইমদাদুলের ভাই মোশারফ আহাজারি করে বলেন, ‘টাকাও গেল ভাইটাও গেল। সঙ্গে আমাদের কপালও পুড়ল। ৩৬ দিন আগে তাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। এক মাস যেতে না যেতেই ভাইয়ের মৃত্যুর খবর। তা মানতে পারছি না।’ 

নিহত আল-আমিনের প্রতিবেশী খালেদ মাহমুদ সুজন বলেন, ‘চার বোন এক ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট আল-আমিন। স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ঋণ করে মাত্র এক মাস আগে সে সৌদি আরব গিয়েছিল। এরই মধ্যে তার মৃত্যুর সংবাদে স্বজন ও গ্রামের লোকজনের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।’

কুষ্টিয়ায় রফিকুলের বাড়িতে শোকের মাতম : পরিবার-পরিজনের জীবিকা নির্বাহে সৌদি আরব গিয়ে মাত্র এক মাস ছয় দিনের মাথায় সড়ক দুর্ঘটনায় লাশ হলেন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার মাধবপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের পুত্র রফিকুল ইসলাম (৪৫)। তার মৃত্যুতে পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নিহত রফিকুলের স্ত্রী হিরা খাতুন বলেন, ‘ধারদেনায় টাকা জোগাড় করে গত ২৪ মার্চ রফিকুল সৌদি আরব যান। ঘটনার পূর্বমুহূর্তে দুপুর ১২টার দিকে পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলের মাধ্যমে কথা বলেছেন রফিকুল। ঘণ্টাখানেক পর থেকেই রফিকুলের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। দুর্ঘটনাকবলিত ওই গাড়িতে থাকা সহকর্মী উপজেলার জুনিয়াদহ গ্রামের রাশিদুলের স্ত্রীর মোবাইল ফোনে জানতে পারি রফিকুল সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।’ রফিকুলের রিতু (১৫) ও সেতু (১০) নামে দুই কন্যা এবং ইব্রাহিম (৪) নামে এক ছেলেসন্তান রয়েছে।

রফিকুলের বাবা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘রফিকুলের মৃত্যু সংবাদ সরকারিভাবে জানানো হয়নি। লোক মারফত শুনেছি। প্রকৃত ঘটনাসহ রফিকুলের অবস্থা সম্পর্কে তথ্য জানাতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানালেন তিনি।

নওগাঁয় দুজনের বাড়িতে মাতম : প্রায় এক মাস আগে সৌদি আরব পাড়ি জমান গিয়াস উদ্দিন মৃধা তোতা। সাড়ে ৩ লাখ টাকার ঋণের বোঝা ছিল তার কাঁধে। স্ত্রী শামীমা ১১ বছরের ছেলে সোয়াইদ মৃধা সাফি, তিন বছরের মেয়ে তানিশা আক্তাকে নিয়ে এখন দিশেহারা। 

মানিক হোসেন তার সংসারে স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন, পাঁচ বছরের ছেলে শাহিন, তিন বছরের মেয়ে শাহিনারা, বাবা রজমান আলী ও মা মানিকজান বিবিকে রেখে তোতার সঙ্গে সৌদি আরব যান। তারা দুজনেই সৌদির আল হারিফ কেটারিং কোম্পানিতে শ্রমিকের কাজ করতেন।

মান্দা থানার তদন্ত পরিদর্শক তারেকুর রহমান জানান, সৌদি আরবের একই কোম্পানিতে কর্মরত টাঙ্গাইলের এক শ্রমিক মোবাইল ফোনের মাধ্যমে গিয়াস ও মানিকের মৃত্যুর সংবাদ তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেন। এরপর থেকে নিহতদের বাড়িতে শুরু হয়েছে শোকের মাতম।