আবহাওয়া অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ান

প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগকে হয়তো ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের গতিপ্রকৃতি এখন আগে থেকেই জানা সম্ভব। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোও সম্ভব। এখানে আবহাওয়া অধিদপ্তরের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আগে থেকেই পূর্বাভাসের মাধ্যমে জনসাধারণকে দুর্যোগের আগাম খবর দেওয়া এবং বিপদের সম্ভাবনা অবহিত করার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটি।

কিন্তু ফণি আঘাত হানার আগেই আবহাওয়া অধিদপ্তরের দুর্বলতা নজরে আসে ওয়েবসাইট অকেজো হওয়ায়। গত বৃহস্পতিবার আবহাওয়া অফিসের ওয়েবসাইট ডাউন হয়ে যায়। সারা দেশ যখন ঘূর্ণিঝড় ফণির আগামবার্তা জানতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল তখন এই ধরনের ঘটনা মোটেই কাম্য ছিল না। আবার ফণি নিয়ে দেওয়া আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা ও পূর্বাভাস ছিল অনেকটাই ভুলে ভরা। ঝড়ের গতিপথ, আঘাত হানার স্থান ও সময় কোনোটাতেই মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঘূর্ণিঝড়টি মেহেরপুর, যশোর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, বরগুনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠিসহ কয়েক জেলা অতিক্রম করার যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল তা সঠিক হয়নি।  তার ওপর ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল, চুয়াডাঙ্গা ও পাবনাসহ অনেক জেলার বিষয়ে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়নি অথচ ঝড়টি দুর্বল হয়ে নিম্নচাপ আকারে ওইসব অঞ্চল দিয়ে অতিক্রম করেছে। গত ২ মে দেওয়া পূর্বাভাসে ঝড় বাংলাদেশে আঘাত হানার সময় শুক্রবার সন্ধ্যা বলা হলেও তা হয়নি। ঝড়ের পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা নিয়ে এই ধরনের ত্রুটি থাকার ফলে কার্যকর প্রস্তুতি নিতে সংশ্লিষ্ট সকল মহল ও জনসাধারণকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।

অন্যদিকে সঠিক পূর্বাভাস দিতে পেরেছে ভারতের আবহাওয়া বিভাগ। এ জন্য সেখানে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়েছে। এড়ানো গেছে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতিও। ওই দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া নির্ভুল সতর্কবার্তার কারণে প্রায় ১১ লাখ মানুষকে আগে থেকে সরিয়ে প্রায় ৯০০টি সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় দেওয়া গেছে। এ জন্য তাদের জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রশংসা করেছে। এমনকি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকেও ভারতের আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাসের প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে।

 

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে দু-এক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশ এক ভয়াবহ বিপর্যয় মোকাবিলা করবে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক ধরনের

প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে। শুধু ফণির মতো ঘূর্ণিঝড় নয়, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুপাত ছাড়া আর প্রায় সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে। সেক্ষেত্রে এই ধরনের দুর্যোগগুলোর মোকাবিলায় বাংলাদেশকে যে তৎপরতা প্রদর্শন করা প্রয়োজন সেখানে আবহাওয়া অধিদপ্তরের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রায় নির্ভুল সতর্কবার্তা ও পূর্বাভাস প্রদানের মাধ্যমে এইসব দুর্যোগ মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি নিয়ে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সেক্ষেত্রে যদি ফণির অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঘটে তাহলে তা বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতা অর্জনে বিশ্বে প্রতিযোগিতা চলছে, যখন আমরা অচিরেই উন্নত বিশ্বে উত্তরণের স্বপ্ন দেখছি তখন আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিজস্ব ট্র্যাক (গতিপথ) ফোরকাস্টিং সিস্টেম না থাকাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। 

পাশাপাশি, গতানুগতিক পরিভাষায় ঘূর্ণিঝড়ের গতি–প্রকৃতিসহ আবহাওয়ার যে পূর্বাভাস প্রচার করা হয়, তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বোধগম্য নয়। বৈজ্ঞানিক পরিভাষা-কণ্টকিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস শুনে বা পড়ে এমনকি শিক্ষিত নাগরিকদের পক্ষেও সম্ভাব্য দুর্যোগের মাত্রা, গতি–প্রকৃতি ইত্যাদি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের আবহাওয়া সম্পর্কিত সংকেতব্যবস্থাটি প্রধানত নৌবন্দরকেন্দ্রিক, যা নৌযান চলাচলের সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকজনের পক্ষে বোধগম্য হলেও সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর হতে পারে। অনেক মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্ভাব্য ঝুঁকির মাত্রা যথার্থভাবে অনুধাবন করতে পারেন না, অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে গড়িমসি এবং সময়ক্ষেপণ করে বিপদগ্রস্ত হন। তাই জনসাধারণের বোধগম্য ভাষায় আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদান করাটা এখন আবহাওয়া অধিদপ্তরের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, আবহাওয়ার নিয়মিত খবর যেমন তাপমাত্রা কত কিংবা তা বাড়বে কি না বা বৃষ্টি হবে কি না ইত্যাদি খবর পাওয়ার জন্যও জনসাধারণ আবহাওয়া অধিদপ্তরের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। তাই এই অধিদপ্তরের সবসময়ে নির্ভুল তথ্য প্রদান করা জরুরি। দেশে আধুনিক ব্যবস্থাসম্পন্ন আবহাওয়া অধিদপ্তর গড়ে তুলতে সরকার সচেষ্ট হবেÑ এটাই সবার প্রত্যাশা।