বোরোর বাম্পার ফলনেও পুঁজিতে টান কৃষকের

দেশের গ্রামগঞ্জের মাঠে-ঘাটে-উঠানে চারদিকে এখন শুধুই সোনালি ধান। চলতি বোরো মৌসুমের ফলন এবার দেশের ইতিহাসের সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। শ্রমে-ঘামে ফলানো ফসলের বাম্পার ফলন দেখে হাসি ফুটেছিল কৃষকের মুখেও। কিন্তু মাঠের সেই খুশি বাজারে গিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। এবারও ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা। ফসল ফলাতে যে খরচ হয়েছে তা ওঠানোই দায় হয়ে পড়েছে। বাজারে ক্রেতা কম। স্থানীয় ক্রেতা যারা কিনছেন (মধ্যস্বত্বভোগী ব্যাপারী) তারাও উপযুক্ত দাম দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ কৃষকদের। সরকারি সংস্থা খাদ্য অধিদপ্তর বাজারে থাকলেও ভালো দাম পাওয়ার বিষয়ে কৃষক একটা ভরসা পেত। কিন্তু ঘোষণা দিয়েও তারা ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান এখনো শুরুই করতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে নিজেদের সঁপে দেওয়া ছাড়া যেন আর কিছুই করার নেই দেশের এক কোটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত মৌসুমে আউশ ও আমনের বাম্পার ফলনের পর বোরোর ফলনও এবার ভালো হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও গত বছরের চেয়ে বেশি, যা দেশের ইতিহাসের সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, নওগাঁ, রাজশাহী ও জামালপুরসহ বেশ কিছু জেলায় ঘূর্ণিঝড় ফণির প্রভাবে ঝড়ো বাতাসে কিছু পাকা ধান শুয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এতে সামগ্রিকভাবে ফসলের ‘তেমন একটা ক্ষতি’ হয়নি বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মীর নুরুল আলম। এক বছরে দেশের সব মৌসুমি ধানের বাম্পার ফলন এবং লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন কৃষিক্ষেত্রে এক বিরাট অর্জন। এটা দেশের জন্য বড় কিছু বয়ে আনলেও এ অর্জনে কৃষকের কপাল খুলছে না। লোকসানি বৃত্ত থেকে তারা বের হতে পারছেন না। আউশ ও আমনের ধারাবাহিকতায় এবার বোরোর বাম্পার ফলন সত্ত্বেও কৃষকের পকেট ফাঁকাই থেকে যাচ্ছে। আউশ ও আমন চাষের ক্ষতির রেশ কাটতে না কাটতেই বোরো আবাদের ক্ষতি মেনে নিতে হচ্ছে। ফলে প্রতি বছরই পুঁজি হারাচ্ছেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক গত বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাত্র ১০ ভাগ ধান কৃষকের ঘরে উঠেছে। এখনই দাম নিয়ে অস্থির হওয়ার কিছু নেই। আমনের পর বোরোরও বাম্পার ফলন হয়েছে। এখন ঘরে তুলতে পারলেই হয়। কীভাবে দাম বাড়িয়ে কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করা যায় সরকার সে বিষয়ে সচেতন। বিদেশে চাল রপ্তানি করে সমস্যার সমাধান করা যায় কিনা তা ভেবে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা গণমাধ্যমের সঙ্গেও কথা বলব।’

সরকার স্থানীয় বাজার থেকে কী পরিমাণ ধান-চাল সংগ্রহ করবে সেই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি। গত ২৮ মার্চ অনুষ্ঠিত এ কমিটির সভায় খাদ্যশস্য উৎপাদন পরিস্থিতি, মূল্য পরিস্থিতি, চাল ও গমের আন্তর্জাতিক বাজারদর, সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুদ পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ পরিস্থিতি, বৈদেশিক আমদানি পরিস্থিতি, বৈদেশিক খাদ্য সাহায্য এবং গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের এলসি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। এ ছাড়া খোলা বাজারে বিক্রি (ওএমএস) এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিসহ সরকারি খাতে খাদ্যশস্য বিতরণের বিভিন্ন কর্মসূচিও পর্যালোচনা করা হয়। সবকিছু আমলে নিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চলতি বোরো  মৌসুমে ১১ লাখ ৫০ হাজার টন সিদ্ধ চাল, দেড় লাখ টন আতপ চাল এবং দেড় লাখ টন ধান সংগ্রহ করার সিদ্ধান্ত হয়। ওই বৈঠকে গত ২৫ এপ্রিল থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রতি কেজি চাল ৩৬ টাকা এবং ধানের সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করা হয় ২৬ টাকা।

কিন্তু ২৫ এপ্রিল থেকে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরুর কথা থাকলেও তা করতে পারেনি খাদ্য অধিদপ্তর। ৩০ এপ্রিলের আগে তারা কোন জেলা থেকে কী পরিমাণ ধান-চাল কেনা হবে সেই বিভাজনই চূড়ান্ত করতে পারেনি। ২৫ এপ্রিলের আগেই খাদ্য অধিদপ্তর সারা দেশের অটো, মেজর ও হাস্কিং রাইস মিলের ধান থেকে চাল করার ক্ষমতা আমলে নিয়ে এক দফা বিভাজন তৈরি করে। কিন্তু খাদ্য মন্ত্রণালয় তা অনুমোদন করেনি। পরে দ্বিতীয় দফায় বিভাজন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় পর্যালোচনার নাম করে সময়ক্ষেপণ করে। এর ফলে ধান-চাল কিনতে সময়মতো বাজারে নামতে পারেনি খাদ্য অধিদপ্তর।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরিফুর রহমান অপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো বাজারে পর্যাপ্ত ধান ওঠেনি। তাছাড়া যে ধান উঠেছে সেগুলোও ভেজা। তাই আমরা একটু সময় নিয়েই সংগ্রহ অভিযানে নামছি।’

এর আগে গত বছরও বোরো সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছিল নির্ধারিত সময়ের পরে। সে বছর ২ মে থেকে সংগ্রহ অভিযান শুরুর কথা থাকলেও শুরু হয়েছিল ১০ মে। কিন্তু ততদিনে কৃষকের ধান চলে গিয়েছিল মধ্যস্বত্বভোগীদের কব্জায়। এরপরই সিদ্ধান্ত হয়েছিল কৃষকের কাছে ধান থাকতে থাকতেই সংগ্রহ অভিযান শুরু করতে হবে। কারণ সংগ্রহ অভিযান শুরু হওয়ার আগেই কৃষকের ধান চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দখলে। কিন্তু এক বছর ধরে প্রস্তুতির পরও সরকার ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারল না।

এদিকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান উৎপাদন হওয়ায় কৃষকের দাম না পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে সরকারও। কৃষি মন্ত্রণালয় ৪৮ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। অথচ চলতি বছর বোরো চাষ হয়েছে ৪৯ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২ শতাংশ বেশি। আর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ৯৬ লাখ টন, যা দেশের ইতিহাসের বোরো উৎপাদনের  সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। উৎপাদনের এই লক্ষ্যমাত্রাও গত বছরের চেয়ে বেশি। ২০১৮ সালে বোরো উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৯৫ লাখ টন। গত বছরের ফলনও তার আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালের তুলনায় প্রায় ৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি। ওই বছর বোরো উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৮০ লাখ টন।

সরকারি হিসাবে বোরো ধান ও চালের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় ধানের উৎপাদন খরচ ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ এবং চালের উৎপাদন খরচ ২ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জমি চষে বলদ বা পাওয়ার টিলারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ধানের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া সেচ খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ধানের উৎপাদন খরচও বেড়েছে। গত মৌসুমে বোরো ধানের উৎপাদন খরচ ছিল কেজিপ্রতি ২৪ টাকা। এবার সেটা ২৪ টাকা ৮৩ পয়সা। আর প্রতি কেজি চালের উৎপাদন খরচ ৩৭ টাকা ২ পয়সা, যা গত মৌসুমে ছিল ৩৬ টাকা।

গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষক কিরণ মিয়া দেশ রূপান্তরকে জানান, এক বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করতে ৩৬ থেকে ৪০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। যার বাজারমূল্য ২ হাজার ৬০০ টাকা। প্রতি বিঘায় শ্যালোমেশিন ভাড়া ৬০০ টাকা, বীজ ৮০০ টাকা, সার ২ হাজার টাকা, কীটনাশক ৮০০ টাকা, নিড়ানি ৬০০ টাকা, হাল-চাষ ১ হাজার টাকা, রোপণ ৬০০ টাকা, ধান কাটা ৮০০ টাকা এবং মাড়াই প্রতি বিঘা ৩০০ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতি বিঘায় বোরো চাষে খরচ হয় প্রায় ১০ হাজার ১০০ টাকা। এর সঙ্গে জমির ভাড়া ২ হাজার টাকা এবং নিজের পারিশ্রমিক ২ হাজার টাকা যোগ করলে প্রতি বিঘার খরচ দাঁড়ায় ১৪ হাজার ১০০ টাকা। প্রতি বিঘায় ২০ মণ ধান উৎপাদন হয়। প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা। এতে বিঘাপ্রতি আয় হয় ১২ হাজার টাকা। এ হিসাবে মুনাফা তো দূরে থাক প্রতি বিঘা জমিতে কৃষকদের লোকসানই গুনতে হচ্ছে ২ হাজার ১০০ টাকা।

কৃষকদের এই লোকসানি বৃত্ত থেকে বের করে আনার উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক এম এ সাত্তার মন্ডল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে জোগান বেশি হলে দাম কমবে। মজুদদাররা এর সুযোগ নিতে চাইবে। এটাই স্বাভাবিক। এ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। চালের দাম বাড়ানোর একটি উপায় হতে পারে বিদেশে চাল রপ্তানি। কিন্তু আমরা যে চাল উৎপাদন করি তার চাহিদা বিশ্ববাজারে নেই। বিশ্ববাজারে সিদ্ধ চাল প্রায় অচল। এই অবস্থায় চাল আমদানিকারক দেশের চাহিদার প্রতি লক্ষ রেখে ধান উৎপাদন করতে হবে। বিশ্ববাজারে সরু ও সুগন্ধি চালের চাহিদা রয়েছে। রান্নার পর যে চালের ভাত একটু আঠালো হয় সেই চাল উৎপাদন করতে হবে। তাহলে বিদেশে চাল রপ্তানির পথ খুলবে।’

সনাতনী পদ্ধতিতে ধান চাষ করলে কৃষকের কপাল খুলবে না উল্লেখ করে এই কৃষি অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘অনেক কৃষক পেয়ারা, আম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করছে। এসব ফসল ধানের চেয়ে লাভজনক। পর্যাপ্ত ধান চাষ করতে হবে এবং সেই সঙ্গে অন্যান্য ফসলের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে।’