বাংলার রাজনীতিতে এই মুহূর্তে এক বর্ণময় চরিত্র তিনি। কখনো আধাসেনা-পুলিশের উপস্থিতিতে বিরোধী পক্ষের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে মুখ ফাটালেন, কখনো ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা পেয়ে টিভি ক্যামেরার সামনে উত্তেজনা ছড়ালেন, কখনো বা লোকলস্কর নিয়ে বহিরাগতদের তাড়া করতে গিয়ে মাটিতে পড়লেন আছাড় খেয়ে। তিনি ভাটপাড়ার অর্জুন সিং। একদা ওই অঞ্চলের দোর্দ-প্রতাপ তৃণমূল নেতা। বর্তমানে ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী।
বস্তুত, তার নাম মাহাত্ম্যেই সোমবার পঞ্চম দফায় বাংলার সাত কেন্দ্রের নির্বাচনে আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল ব্যারাকপুর। নির্বাচন কমিশনের বাড়তি মাথাব্যথা ছিল ব্যারাকপুরকে নিয়েই। ভোটের আগের দিনই অর্জুন জানিয়ে দিয়েছিলেন, সব ভোটে তার আলাদা-আলাদা ‘অপারেশন’। আর কার্যক্ষেত্রেও দিনভর নিজে ময়দানে নেমে সেই ‘অপারেশনেই’ ব্যস্ত রইলেন এই ছোট্টখাট্ট চেহারার মানুষটা। মাঝ বৈশাখের ঠা-ঠা রোদে চাঁদিফাটা গরমে ঘামতে ঘামতে, লোকজন, কেন্দ্রীয় রক্ষীদের পাহারা বেষ্টিত হয়ে দৌড়ে বেড়ালেন নিজের নির্বাচনী কেন্দ্রের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। ভোট শুরুর পর দেড়ঘণ্টাও তখন কাটেনি, মোহনপুরের এক ফুলের দোকানের সামনে নাটক জমিয়ে দিলেন অর্জুন। দলের এজেন্টদের বুথে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, এই অভিযোগ পেয়ে সেখানে গিয়ে স্বয়ং জড়িয়ে পড়লেন তৃণমূল সমর্থকদের সঙ্গে হাতাহাতিতে। যুযুধান দুই পক্ষকে সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী। একসময় দেখা যায়, অর্জুনের ঠোঁট ফেটে রক্তের ধারা। তার অভিযোগ, পুলিশের সামনেই তাকে মেরেছে তৃণমূলের গুন্ডারা!
তবে এরপরও থামেনি অর্জুনের ‘অপারেশনের’ রথ। নৈহাটির বিজয়গড়ের এক বুথে ছাপ্পা ভোট দেওয়া হচ্ছে খবর পেয়ে সেখানে দৌড়ে যান তিনি। সঙ্গে অবশ্যই সদ্য প্রাপ্ত জেড ক্যাটাগরি নিরাপত্তা। তবু সেখান থেকে ফিরতে হয় তাকে তৃণমূল সমর্থকদের ‘গো ব্যাক’ স্লোগানে কান ভারী করে। নৈহাটিরই বিজয়গড়ে বহিরাগত লোকজনকে তাড়া করে রীতিমতো দৌড়াতে দেখা যায় তাকে। তৃণমূলের টিকিটে অর্জুন জেতেন ভাটপাড়া বিধায়ক পদে। সেখানে তার অখ- প্রতাপ। তবে ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে ভাটপাড়া ছাড়াও আরও ছটি বিধানসভা ক্ষেত্র। এই সুবিশাল এলাকাকে তৃণমূলমুক্ত করার ‘অপারেশন’ একা অর্জুনের পক্ষে কার্যত ছিল অসম্ভব। প্রতিপক্ষ তৃণমূল প্রার্থী প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী কিন্তু এদিন ছিলেন দৃশ্যতই নিরুদ্বিগ্ন। গত নির্বাচনে এই কেন্দ্রেই তিনি জিতেছিলেন ২ লাখ ৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে। একমাত্র ভাটপাড়া ছাড়া বাকি ছটি বিধানসভা ক্ষেত্রতেই বড় মার্জিনে লিড ছিল তার। ভাটপাড়া কেন ব্যতিক্রম? এ প্রশ্নে দীনেশ ত্রিবেদীর সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘অর্জুনের সাবোটাস’। আর অর্জুনের গায়ে এদিন যে হাত পড়ল সে সম্পর্কে তার মন্তব্য ‘অর্জুন তো বাহুবলী। ওকে কে মারবে!’
অশান্তির আশঙ্কায় এদিন পঞ্চম দফায় সাত কেন্দ্রের জন্য ৫৩০ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে ৫৫ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয় শুধু ব্যারাকপুর কেন্দ্রেই। তবু কমিশন কথিত ‘শান্তিপূর্ণ’ ভোটেও জমা পড়েছে ভূরি ভূরি অভিযোগ। শুধু ব্যারাকপুর নয়, শ্রীরামপুর, হুগলি, আরামবাগ, বনগাঁ, হাওড়া ও উলুবেড়িয়া থেকে বিরোধীরা রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট, রিগিং, বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টদের বুথে ঢুকতে না দেওয়া, তাদের ওপর মারধরের অভিযোগ তুলেছেন। ব্যারাকপুরের দত্তপুকুর, বনগাঁর হিংলিতে ব্যাপক বোমাবাজির ঘটনা ঘটে। হুগলি কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী লকেট চট্টোপাধ্যায় ধনেখালির এক বুথে ঢুকে শুধু প্রিসাইডিং অফিসার নন, তৃণমূলের এজেন্টকে ‘মেরে চামড়া গুটিয়ে দেব’ বলেও হুমকি দেন। শাসকদলের স্বেচ্ছাচারী কা-কারখানা দেখে তিনি এতটাই উত্তেজিত। পরে উত্তেজনা আরও বাড়ে, ভাঙচুর করা হয় লকেটের গাড়ি। ভাঙা হয় ইভিএমও।
কমিশন যতই বলুক ভোট শান্তিতে, এদিন নির্বাচনের মাঝপথেই ব্যারাকপুরে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়ে দেয় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা প্রকাশ জাভড়েকর দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে জানান, শুধু ব্যারাকপুর নয়, শ্রীরামপুরেও ফের ভোটের দাবিতে নির্বাচন কমিশনে যাচ্ছেন তারা। জাভড়েকর বলেন, ‘ব্যারাকপুরে আমাদের প্রার্থীকে জঘন্যভাবে মারা হয়েছে, পোলিং এজেন্টদের মারধর করা হচ্ছে, বুথে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।’ তার অভিযোগ, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝে গেছেন তিনি হারছেন, তাই রিগিং করে, ছাপ্পা দিয়ে ভোট জিততে চাইছেন। গণতান্ত্রিক নির্বাচন নয়, ভোট লুট হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে।’
তৃণমূল অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়নের পক্ষেই ভোট দিচ্ছেন মানুষ।’