স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা জীবিকার অধিকার নয়, গরিবগুর্বো খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ বা কৃষিজীবী গ্রামীণ জনতার সাম্প্রতিক সমস্যাও নয়, বাংলার ভোটের প্রচারে এখন উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেছে এক পৌরাণিক চরিত্র। নির্বাচনের ভরা বাজারে নেতাদের মুখে মুখে ফিরছে রামনাম। রাম-জন্মভূমি অযোধ্যা নয়, এই বাংলায়। রামনামের ধুয়ো তুলে উসকে দেওয়া হচ্ছে বিতর্ক, রামনাম ঘিরেই জমে উঠেছে রাজনৈতিক তরজা। ভোট প্রচারের মঞ্চে উঠলেই নেতা-নেত্রীদের মুখে মুখে ফিরছে তারই নাম। নির্বাচনী লক্ষ্যভেদে রামনাম যেন হয়ে উঠেছে ব্রহ্মাস্ত্র। ঘটনার সূত্রপাত দিনতিনেক আগে। গত শনিবার চন্দ্রকোনা যাওয়ার
গাড়ি থেকে নামতে দেখে ওই লোকজন পালাতে শুরু করলে মুখ্যমন্ত্রী বলে ওঠেন, ‘পালাচ্ছিস কেন, আয়...।’ পরে পুলিশ এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজন বিজেপি কর্মীকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদ করে পারে তাদের ছেড়েও দেওয়া হয়। তার পর থেকেই এই ঘটনাকে ‘মমতা দিদির’ বিরুদ্ধে নির্বাচনী ইস্যু করে তুলেছে বিজেপি। বিজেপি রাজ্য-নেতৃত্ব থেকে শুরু করে এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও রামনামকেই বেছে নিয়েছেন তৃণমূল নেত্রীর বিরুদ্ধে তাদের অস্ত্র হিসেবে। মমতার বিরুদ্ধে এত দিন যে মুসলিম তোষণের অভিযোগ করে আসছিল গেরুয়া শিবির, তার পালে নতুন করে বাতাস বইয়ে দিয়েছে চন্দ্রকোনা রোডের ঘটনা। এমনটাই মনে করছে বিজেপি।
সোমবার ঝাড়গ্রামের প্রচারসভায় যেখানে শেষ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, মঙ্গলবার ঘাটালের নির্বাচনী সভায় দাঁড়িয়ে সেখান থেকে আক্রমণ শুরু করলেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। ঘাটালে দলীয় প্রার্থী ভারতী ঘোষের সমর্থনে প্রচারে এসে অমিত শাহর হুংকার, ‘ভারতবর্ষ পাকিস্তান বা আফগানিস্তান নয়। বাংলায় আমরা হাজার বার জয় শ্রীরাম বলব। মমতা দিদি পারলে আটকান।’
ঝাড়গ্রামে অবশ্য নরেন্দ্র মোদি সভাই শুরু করেন ‘জয় শ্রীরাম’ বলে। তারপর বলেন, ‘জয় শ্রীরাম বলায় দিদি লোককে জেলে ঢোকাচ্ছেন। আমারও মনে হলো, আমিও দিদিকে জয় শ্রীরাম বললে আমাকেও জেলে ঢুকিয়ে দেবেন। নির্দোষ যারা জেলে রয়েছেন তাহলে আমি তাদের সেবা করতে পারব।’ এরপরই মোদি বলেন, ‘আমি বলে দিতে চাই, রাম আমাদের মাথার ওপর, রাম রয়েছেন আমাদের শিরায় শিরায়, আমাদের সংস্কৃতিতে।’ বলেন, ‘দিদিকে সতর্ক করে দিচ্ছি, এত অহংকার ভালো নয়। রামের সামনে বড় বড় ব্যক্তির অহংকার চূর্ণ চূর্ণ হয়ে গেছে। আপনার এত অহংকার কোথায় থাকবে!’
তবে এসব শুনে চুপ করে নেই মমতাও। জবাব দিয়েছেন পত্রপাঠ। বলেছেন, ‘ভোট এলে তোমাদের মুখে রামনাম। রামকে তোমরা বিজেপির ইলেকশন এজেন্ট বানিয়েছ। মোদিবাবু, গত পঁাঁচ বছরে কটা রামমন্দির বানিয়েছেন আপনারা! এখন ভোট এসেছে তাই রামনামের বান ডাকাচ্ছ।’
এদিন বাঁকুড়ার রানিবাঁধে নির্বাচনী সভায় দাঁড়িয়েও মমতা মোদি-অমিত শাহর সমালোচনার জবাব দেন। তিনি বলেন, “তুমি ঠিক করে দেবে নাকি আমি কী স্লোগান দেব! তুমি যাকে বলবে তাকেই মানতে হবে নাকি? আমি মানব না। ভারতবর্ষ, বাংলার মাটিতে আমি সব ধর্ম, সব ঠাকুর, সব সংস্কৃতি জানি। আমাদের স্লোগান ‘জয় হিন্দ’, ‘বন্দেমাতরম’, ‘জয় জওয়ান জয় কিষান’, ‘মা-মাটি মানুষ’। মরে গেলেও বিজেপির স্লোগান আমার মুখ দিয়ে বেরোবে না, এটা মনে রাখবেন।”
প্রধানমন্ত্রীকে পাল্টা আক্রমণ করে মমতার সরাসরি তীর, ‘বাংলায় এসে মিথ্যা কথা বলেন মোদি। বলেন আমি এখানে দুর্গাপুজো করতে দিই না। মা দুর্গার কটা হাত উনি জানেন? এখানে সব পুজো হয়। আমি জয় মা দুর্গা বলব, জয় মা কালী বলব। তোমাদের মতো ভোট এলেই রামনাম জপব না। তুমি বাংলার কালচার ভুলিয়ে দেবে, এত বড় ক্ষমতা?’
বাঁকুড়ায় দলীয় প্রার্থী তথা দলের বরিষ্ঠ নেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের সমর্থনে রানিবাঁধের সভার শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী জনতাকে স্মরণ করিয়ে দেন, ‘মনে আছে তো আজ অক্ষয় তৃতীয়া। এই সঙ্গে আজ রমজান মাসের প্রথম দিন। তাই দিনটা বড় পবিত্র। বিজেপির হিন্দুত্বের ঢেউয়ে এভাবেই বারবার ধাক্কা দিয়ে একের পরে এক নির্বাচনী সভা করে চলেছেন মমতা। ধর্ম আর রাজনীতির এই টানাপড়েনের ফলে কার দিকে জনরায়ের পাল্লা ভারী হয় তা বোঝা যাবে ২৩ মে ভোট গণনার পরই। তবে রাজ্য-রাজনীতির হালহকিকতের খবর যারা রাখেন তারা বলছেন, একদা মাওবাদী সন্ত্রাসে দীর্ণ আদিবাসী অধ্যুষিত এই জঙ্গলমহালের রাজনীতিতে রামনামের সস্তা মিশেল বড়ই বেমানান।