রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন সাদেক খান কৃষিবাজার ঘেঁষে শত শত টিনের ঘর। বৈশাখের প্রখর রোদে যেন ভাপ উড়ছে বস্তিতে। এখানে বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার বালাই নেই। গরমে নাকাল মমতাজ বেগম গায়ে পানি ঢেলে রান্নাঘরে বসে করলা কুটছিলেন। মাটিকাটা শ্রমিক আতিকুল ইসলামের স্ত্রী মমতাজ জানালেন, প্রথম রোজার ইফতার হবে ভাত আর এই করলা ভাজিতে। কিন্তু রান্না হবে কিসে? এ নিয়ে মমতাজের বিরক্তি আর আক্ষেপের শেষ নেই। সকাল ৬টায় চলে গেছে গ্যাস, আসবে রাত ১২টার পর। ভরসা এখন লাকড়িতে। এক বছর ধরে এটা নিয়ম হয়ে গেছে। মমতাজ জানান, তার ছয়জনের সংসারে প্রতিদিন পাঁচ কেজি করে লাকড়ি লাগে। এতে মাসিক ব্যয় হয় ১ হাজার ৮০০ টাকা। কিন্তু বাসায় ওঠার সময় মালিক গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বিল হিসাব করে মোট ভাড়া ধরেছেন সাড়ে ৩ হাজার টাকা। এতে গ্যাস খরচ না করেও নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে তাকে। দেশ রূপান্তরকে মমতাজ বলেন, ‘গরিবরে মানুষ অ্যামনেই মারে।’ গতকাল মঙ্গলবার ঘুরে পাশাপাশি বস্তি এবং আবাসিক এমন এলাকা মোহাম্মদপুরের কাদিরাবাদে গ্যাস সরবরাহে ব্যাপক তারতম্য দেখা গেছে। কাদিরাবাদ হাউজিং এলাকার অনেক বাড়িতে গ্যাস থাকলেও একই সময়ে বস্তিতে পাওয়া যায়নি। মৃতপ্রায় ছোট্ট কাটাসুর খালের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত কাদিরাবাদ হাউজিংয়ে গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা যায় চুলা জ্বলছে। তবে খালের পশ্চিম প্রান্তে গড়ে ওঠা বোটঘাট বস্তিতে একই সময় গ্যাস পাওয়াই যাচ্ছে না। এখানকার বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম জানান, সকাল ৭টার আগে গ্যাস চলে যায়। দুপুর ২টায় অল্প পাওয়া যায়। সন্ধ্যার পর আবার চলে যায়। তখন ১২টার আগে আর আসে না। এ গ্যাস যায় কোথায়? প্রশ্ন মনোয়ারার।
একই রকম অভিজ্ঞতা রাজধানীর হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, লালবাগ, মিরপুরের বেশিরভাগ বস্তি এলাকার। বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবার রোজায় ভয়ানক গ্যাস ঘাটতি দেখা দেয়। এমনও দিন আসে যে সাহরি পর্যন্ত খাওয়া হয় না। এতে বাধ্য হয়ে অনেকে লাকড়ি অথবা এলপি গ্যাস ব্যবহার করেন। তবে বেশিরভাগ মানুষ নি¤œ আয়ের হওয়ায় জ্বালানি খরচ জোগাতে বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে তাদের। প্রেমতলা বস্তির লাভলী খাতুন বলেন, ‘মাঝে মাঝে এমন অবস্থা হয় যে, তিন-চাইর গেরস্তি রাইনতে পারি না। তখন পোলা-মাইয়া লইয়া মহাবিপদে পড়তে হয়। এখন রোজায় যদি এই অবস্থা হয়, তাইলে না খাইয়া মইরা যাইতে হইব।’
জানতে চাইলে তিতাস গ্যাসের উপমহাব্যবস্থাপক আরমানুর রেজা ভূঁইয়া বস্তি এলাকার বেশিরভাগ গ্যাস-সংযোগ অবৈধ বলে দাবি করেন। তবে এ প্রতিবেদক অনেক বস্তিতে তিতাসের দেওয়া প্রিপেইড মিটার দেখেছেন জানালে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমি বলছি না সব অবৈধ সংযোগ। তবে তারা প্রথমে যে পাইপের মাধ্যমে গ্যাস নেয়, পরে তা টেনে বাড়িয়ে সংযোগ বৃদ্ধি করে। এতে সেখানে গ্যাস কম যায়।’ এমন যুক্তিতে দ্বিমত প্রকাশ করে দুজন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। দেশ রূপান্তরকে তারা বলেছেন, ‘কারিগরি অদক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে এ বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে।’
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক সময় গ্যাস রেশনিং (অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া) করে সরবরাহে বিঘœ সৃষ্টি করা হয়। সরকারের মনোভাব এমন যে সবকিছুতে বৈষম্য থাকতেই হবে। গ্যাস সরবরাহে ভয়ানক অদক্ষতার কারণে এমন ঘটনা ঘটছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তিতাস গ্যাসে পেশাদারি লোকের অভাব আছে। সরবরাহ লাইনে ত্রুটি থাকলেও সেদিকে প্রতিষ্ঠানটি দক্ষতা বাড়াতে পারছে না।’
বুয়েটের অধ্যাপক ম তামিম বলেন, ‘তিতাসের সরবরাহ লাইনে অনেক ত্রুটি আছে। এ ছাড়া গ্যাসের চাপ কম থাকলে লাইনের শেষের দিকে যারা থাকে তারা এমনিতে গ্যাস কম পায়।’
পেট্রোবাংলার হিসেবে, বর্তমানে দেশে গ্যাসের মজুদ ১২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এই গ্যাস দিয়ে বাংলাদেশ আরও ১০ বছর চলার কথা থাকলেও ঘাটতির কথা বলে গত বছরের জুলাই থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করছে সরকার। সম্প্রতি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ আরও ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি শুরু করে। এসব দিয়ে আবাসিক, শিল্পসহ সব ঘাটতি মোকাবিলা করা সম্ভব বলে জানিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।