‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়’ বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠুক

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবির্ভাব একটি যুগান্তকারী ঘটনা। প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯২ সালে। শুরুতেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভাড়া বাড়িতে/বাণিজ্যিক ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৯২’-এর আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিচালনা শুরু হয়। বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের খ-কালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। তবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ এবং রেজিস্ট্রারের মতো সর্বোচ্চ পদগুলোতে নিয়োগ দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০’ (সংশোধনীসহ) এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় এখনো এই আইনের সব শর্ত পূরণ করতে পারছে না। এ কারণে আমরা প্রায়শই ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের’ নানা অনিয়মের খবর পাই। এখন প্রশ্ন হলো গত ২৭ বছর ধরে অনিয়মগুলো কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো? এগুলো দেখভাল করার দায়িত্ব কার?

অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার মান ছাড়াও কেবল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনার ক্ষেত্রে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন যেসব অনিয়ম চিহ্নিত করেছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ

(ক) নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে না পারা; (খ) শিক্ষা মন্ত্রণালয়/বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কাছ থেকে ‘স্থায়ী সনদ’ অর্জন করতে না পারা; (গ) নিয়মিত বাৎসরিক অডিট রিপোর্ট জমা না দেওয়া; (ঘ) বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের পদ শূন্য থাকা; (ঙ) শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি’র অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারা; (চ) সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুশাসন (আর্থিক ও প্রশাসনিক) প্রতিষ্ঠা করতে না পারা

কিন্তু এসব অনিয়মের প্রশ্রয়দাতা কে বা কারা? ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০’ কি এসব অনিয়ম দূরীকরণে যথেষ্ট নয়? না হয়ে থাকলে কেন নয়? সমস্যা কি তাহলে ‘সর্ষের ভেতরেই ভূত’? এখন মোট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৪টি। তার মধ্যে ৯৫টির কার্যক্রম চলছে। এখনো পর্যন্ত মাত্র ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পেরেছে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই স্থায়ী সনদপ্রাপ্ত নয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সনদ পেয়েছে। (সূত্র : সংবাদ, ২৮ এপ্রিল ২০১৯)

গত তিন-চার বছরের সংবাদপত্রের খবরাখবর থেকে আমরা জানি হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় বাৎসরিক অডিট রিপোর্ট জমা দিয়েছে। বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের শূন্যপদ পূরণে সচেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি’র অর্থ কীভাবে কোন খাতে (আয়-ব্যয়ের হিসাব) ব্যবহৃত হচ্ছে তার কোনো সুস্পষ্ট চিত্র স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের বাৎসরিক বাজেটে দৃশ্যমান নয়। গত ৬ এপ্রিল, ২০১৭ দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটি কোটি টাকা লোপাট’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু এইসব অনিয়ম চালু রেখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা আদৌ কি সম্ভব?

এসব অনিয়মের বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অন্যরকমের কিছু সমস্যা বিরাজ করছে, যেগুলো সচরাচর আমাদের আলোচনা-সমালোচনায় আসছে না। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনও এগুলোকে আলোচনার টেবিলে খুব জোরেশোরে আনছে না। আজকের এই লেখায় সেইসব ‘সমস্যাগুলো’ চিহ্নিত করতে চাই।

১) বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও সুলিখিত কোনো ‘চাকরি বিধিমালা’ নেই। গত ৩০ এপ্রিল ২০১৯, দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘শিক্ষার মানে নজর কম, লাভে ঝোঁক বেশি’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী মোট ১৬ হাজার ২০ জন শিক্ষক ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। তার মধ্যে ১০ হাজার ৯৩২ জন স্থায়ী পদে এবং ৫ হাজার ৮৮ জন খ-কালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত। এর মধ্যে ২,৪০৩ জন অধ্যাপক, ১,৪৪০ জন সহযোগী অধ্যাপক, এবং পিএইচডিধারী ৩,৪১৬ জন শিক্ষক আছেন। আবার খ-কালীন শিক্ষকদের মধ্যে ১,৬১১ জন অধ্যাপক, ৭৬০ জন সহযোগী অধ্যাপক, এবং পিএইচডিধারী ২,০১০ জন নিয়োজিত আছেন। তথাপি স্থায়ীপদে চাকরিরত শিক্ষকদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করে, কারণ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো চাকরি বিধিমালা বা ‘সার্ভিস রুল’ নেই। থাকলেও সেটি শিক্ষক-বান্ধব তো নয়ই বরং একপেশে এবং হয়রানিমূলক।

২) বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘চাকরি বিধিমালা’ না

থাকার কারণে শিক্ষকরা তাদের চাকরিতে অনিরাপত্তায় ভোগেন। এছাড়াও চাকরিজীবন শেষে ভবিষ্যৎ তহবিল, গ্রাচ্যুইটি, এবং পেনশন স্কিম না থাকার কারণে শঙ্কা ও অনিরাপত্তাবোধ দিন দিন বেড়েই চলেছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে এগুলো চালু থাকলেও তা খুবই সীমিত আকারে। এমনও উদাহরণ আছে একজন শিক্ষক (সহকারী অধ্যাপক) পাঁচ/সাত বছর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পর অন্য কোনো পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে বাধ্য হন শুধুমাত্র ভবিষ্যৎ তহবিল, গ্রাচ্যুইটি এবং পেনশন স্কিম না থাকার কারণে। এটি এই পেশার জন্য একটি ‘বড় সমস্যা’। কোনো কারণ না দেখিয়েই শিক্ষক ছাঁটাই করার ঘটনাও আমরা প্রায়শই শুনে থাকি। এগুলো বন্ধ হওয়া দরকার।

৩) একজন শিক্ষক প্রভাষক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে সর্বশেষ কোন পদে গিয়ে চাকরি শেষ করবেন তারও সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই নেই। অনেক ক্ষেত্রে বিভাগের চেয়ারম্যান/বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু এই দায়িত্বেরও কোনো সুনির্দিষ্ট মেয়াদ নেই। অনুষদগুলোর ডিন পদেরও কোনো সুনির্দিষ্ট মেয়াদ নেই। খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোতে এরকম চিত্র দেখা যাবে যেখানে সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই কোনো জ্যেষ্ঠ শিক্ষক (পদোন্নতি পেয়ে যিনি সহযোগী অধ্যাপক/অধ্যাপক হয়েছেন) বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পক্ষ থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে কি না আমরা জানি না। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের (স্থায়ী পদে যারা দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত রয়েছেন) একটি বড় অংশ দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার এবং দক্ষতা প্রমাণ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। সে কারণেই বেশ পুরনো কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগ এখনো পর্যন্ত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক/লিয়েন নিয়ে আসা অধ্যাপকদের’ ওপর নির্ভর করছে এবং বিভাগীয় কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করছে। এতে করে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভেতর থেকে ‘অ্যাকাডেমিক নেতৃত্ব’ তৈরি হচ্ছে না। তাই ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০’ সংশোধন করে একে যুগোপযোগী এবং ‘শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবান্ধব’ করা অতীব জরুরি।

তাছাড়া, কেবল ‘স্থায়ী ক্যাম্পাস’-এর বন্দোবস্ত করাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকে থাকা এবং মানসম্মত শিক্ষাপ্রদান নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে চিহ্নিত না করে সত্যিকার অর্থে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ (টিচিং ইউনিভার্সিটি/রিসার্চ ইউনিভার্সিটি) হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষসহ সবাইকে একযোগে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ইংরেজি বিভাগ, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ